মিডফিল্ড মার্শাল মদ্রিচের বিদায়

c43f2031-a2c6-4b68-9d2e-b872b4482a0e-02-03
আরিফুল হক বিজয়

মিডফিল্ড মার্শাল মদ্রিচের বিদায়

ক্রীড়াক্ষেত্রে ‘বিদায়’ বলতে একটা টার্ম আছে। আদতে জীবনের দর্শনের সঙ্গে এই টার্মের দীর্ঘ মেলবন্ধন। যেকোনো কিছুরই উপসংহারের শেষ শব্দ ‘বিদায়’। তবে ফুটবলের মাঠে কিছু ক্ষেত্রে বিদায় কেবলই শব্দ, যার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে কীর্তিমানের কীর্তিগাথা। আর শেষ ম্যাচটা হয় অমরত্বের। যেখানে একটি যুগের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হলেও ছড়িয়ে থাকে সুবাস। টরন্টোর স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজার পর সেই দৃশ্যটাই দেখা গেল। স্কোরবোর্ড বলছে, পর্তুগাল ৩-১ ব্যবধানে জিতেছে। কিন্তু সেই মুহূর্তে সংখ্যার হিসাব কেউ রাখছিল না। সব চোখ আটকে ছিল একটি মানুষকে ঘিরে। ভিএআরের পর্দায় অফসাইডের সিদ্ধান্ত ভেসে উঠতেই লুকা মদ্রিচের চোখে জমে ওঠা জল যেন বলে দিল—সব যুদ্ধেরই একদিন শেষ হয়। থেমে গেলেন ক্রোয়াট মিডফিল্ড মার্শাল মদ্রিচ!

ক্রোয়েশিয়ার ১০ নম্বর জার্সিটি শুধু এক টুকরো কাপড় নয়; দুই দশকের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর এক অসম্ভব দেশের অসম্ভব এক গল্প। যে গল্পের চরিত্রের নাম মদ্রিচ; ওয়ান অ্যান্ড অনলি ক্রোয়াট মিডফিল্ড জাদুকর। মাত্র ৪০ লাখ মানুষের একটি দেশকে বিশ্ব ফুটবলের মহাশক্তিদের কাতারে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার স্থপতির নাম লুকা মদ্রিচ।

বিজ্ঞাপন

ফুটবলে ‘ফিল্ড মার্শাল’ শব্দটি খুব বেশি ব্যবহার হয় না। কিন্তু মদ্রিচকে দেখলে শব্দটি যেন নিজেই তার অর্থ খুঁজে পায়। যুদ্ধক্ষেত্রে একজন ফিল্ড মার্শাল যেমন পুরো বাহিনীর গতি, ছন্দ ও কৌশল নিয়ন্ত্রণ করেন, তেমনি সবুজ ঘাসের ক্যানভাসে ক্রোয়েশিয়ার প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি রক্ষণ, প্রতিটি নিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করতেন মদ্রিচ। তিনি গোল করতেন না সব সময়, কিন্তু গোলের গল্পটা শুরু হতো তার পা থেকেই। তিনি আলো কেড়ে নিতেন না, বরং আলোটা অন্যদের দিকে ছড়িয়ে দিতেন।

২০০৬ সালে জার্মানির নুরেমবার্গে শুরু হয়েছিল তার বিশ্বকাপ অভিযাত্রা। তখন তিনি ছিলেন সম্ভাবনাময় এক তরুণ। ২০ বছর পরে ২০২৬ সালে টরন্টোতে শেষ হলো সেই যাত্রা। মাঝখানের পথটা শুধু ম্যাচের নয়, ইতিহাসের। পাঁচটি বিশ্বকাপ। ২৩টি ম্যাচ। দুটি গোল। অসংখ্য অ্যাসিস্ট, অগণিত নিখুঁত পাস, আর এমন এক নেতৃত্ব, যার পরিসংখ্যান তৈরি করা যায় না।

২০১৮ সালে রাশিয়ায় তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। ক্রোয়েশিয়াকে প্রথমবারের মতো তুলেছিলেন বিশ্বকাপের ফাইনালে। পুরো টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে জিতেছিলেন গোল্ডেন বল। সেই বছরই ভেঙেছিলেন মেসি-রোনালদোর এক দশকের আধিপত্য। জিতেছিলেন ব্যালন ডি’অর। ফুটবল যেন একবারের জন্য হলেও মাথা নত করেছিল এক নীরব শিল্পীর সামনে।

২০২২ সালে আবারও দেখিয়েছিলেন, বয়স কেবল সংখ্যার নাম। ব্রাজিলকে বিদায় করে ক্রোয়েশিয়াকে এনে দিয়েছিলেন তৃতীয় স্থান। সেদিনও মাঝমাঠে তিনি ছিলেন ক্রোয়াট স্কোয়াডের পরিচালক আর এবার? শেষ বিশ্বকাপেও নিজের পরিচয় বদলাননি। বিদায়ী ম্যাচে ৪০ বছর বয়সি মদ্রিচই ছিলেন ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ। সবচেয়ে বেশি ৬৬ বার বল স্পর্শ, তিনটি সফল ট্যাকল, দ্বিতীয়ার্ধে দুটি দুর্দান্ত ক্রস—শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যেন তিনি বিশ্বাস করছিলেন, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।

কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো নিষ্ঠুর। শেষ মুহূর্তে জালে বল জড়ালেও ভিএআরের অফসাইডের সিদ্ধান্তে বাতিল হয়ে গেল গোল। সেই এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল পুরো জাতির স্বপ্ন। মদ্রিচ দাঁড়িয়ে রইলেন স্থির। যেন একজন সেনাপতি বুঝে গেছেন—শেষ দুর্গটিও হারিয়ে গেছে।

শেষ বাঁশির পর এগিয়ে এলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দুই কিংবদন্তি একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। একসময় রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুমে পাশাপাশি বসা দুই মহাতারকা আবারো দাঁড়ালেন একসঙ্গে, তবে এবার একজনের বিদায়ের সাক্ষী হয়ে। রিয়াল মাদ্রিদের সোনালি যুগের এই জুটি চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিল একসঙ্গে। একজন ছিলেন গোলের রাজা, অন্যজন সেই গোলের সুরকার। মদ্রিচের গল্প অবশ্য ট্রফি দিয়েও পুরোটা বলা যায় না।

রোনালদো বললেন, ‘লুকার সঙ্গে আমি অসংখ্য ম্যাচ খেলেছি এবং আমাদের বয়সও প্রায় কাছাকাছি। ও ফুটবল ইতিহাসের এক সত্যিকারের কিংবদন্তি। তার ক্যারিয়ারের আগামী বছরগুলোর জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। তার বিপক্ষে আবারও মাঠে নামতে পারাটা সত্যিই দারুণ এক অভিজ্ঞতা ছিল।’

যুদ্ধবিধ্বস্ত শৈশব থেকে উঠে আসা ছেলেটি একসময় ভেড়া চরিয়েছে, শরণার্থী শিবিরে থেকেছে, গোলার শব্দ শুনে বড় হয়েছে। সেই শিশুটিই পরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরো পৃথিবীকে শিখিয়েছে—প্রতিভা জন্ম নেয় না আরাম-আয়েশে, জন্ম নেয় প্রতিকূলতার আগুনে।

মদ্রিচ কখনো কেবল একজন মিডফিল্ডার ছিলেন না। তিনি ছিলেন সময়ের গতি নিয়ন্ত্রক। তিনি ছিলেন খেলার ছন্দের স্থপতি। তিনি ছিলেন নেতৃত্বের নীরব সংজ্ঞা। তিনি ছিলেন ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ড মার্শাল। তার পাসগুলো ছিল আদেশের মতো, সতীর্থদের দৌড় ছিল সেই নির্দেশের বাস্তবায়ন। পুরো মাঠ যেন তার চোখ দিয়ে দেখত, তার মস্তিষ্ক দিয়ে ভাবত। এমন ফুটবলার কতজন আসে?

আর কোনো বিশ্বকাপে ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঝ মাঠে বল চাইবেন না লুকা মদ্রিচ। আর কোনো সন্ধ্যায় নিখুঁত আউটসাইড পাসে প্রতিপক্ষের রক্ষণ চিরে দেবেন না। আর কোনো অতিরিক্ত সময়ে ক্লান্ত পায়ে পুরো দলকে সামনে ঠেলে দেবেন না। রূপকথার গল্প থেমে গেছে ভরা টরন্টোতে।

কিন্তু কিছু মানুষ বিদায় নিলেও খেলা থেকে হারিয়ে যান না। তারা থেকে যান প্রতিটি নিখুঁত পাসে, প্রতিটি সাহসী নেতৃত্বে, প্রতিটি ছোট দেশের বড় স্বপ্নে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক গোলের গল্প লেখা হবে, অনেক শিরোপার গল্পও। কিন্তু মাঝমাঠের এক নীরব সেনাপতির গল্প আলাদা করেই বলা হবে। ফুটবল হয়তো আবারও অসাধারণ মিডফিল্ডার পাবে। কিন্তু ‘মিডফিল্ড মার্শাল’ লুকা মদ্রিচ থেকে যাবেন ‘ওয়ান অ্যান্ড অনলি’।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন