ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মদ্যপান ও উচ্চ শব্দে চেঁচামেচির প্রতিবাদ করায় মণিপুরের এক সঙ্গীতশিল্পীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহত চোংথম বিক্রম সিংহ মণিপুরের বাসিন্দা এবং একজন সঙ্গীতশিক্ষক ও গিটারবাদক ছিলেন।
রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির কিলোকরি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, বাড়ির সামনে কয়েকজন বাবুর্চি ও ডেলিভারি কর্মী মদ্যপান করে উচ্চ শব্দে চেঁচামেচি করছিলেন। বিক্রম নিচে নেমে তাদের শব্দ কমাতে বলেন এবং এভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রতিবাদ করেন। এরপর তাকে একদল ব্যক্তি ধাওয়া করে মারধর করেন।
পুলিশের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা প্রথমে বিক্রমের বাসার ভেতরে ঢুকে তাকে মারধর করেন। পরে তাকে বাইরে বের করে ধাওয়া করে ভবনের তিনতলার সিঁড়ির কাছে নিয়ে গিয়ে আবারও মারধর করে।
ঘটনার দুটি সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশের হাতে এসেছে। একটি ফুটেজে হামলার পর কয়েকজনকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে দেখা যায়। প্রায় ১০ মিনিট পরের আরেকটি ফুটেজে পরিবারের সদস্যদের রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত বিক্রমকে ধরে নিচে নামিয়ে আনতে দেখা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, সানলাইট কলোনি থানা রাত ১টা ৩৮ মিনিটে ফোনে হামলার খবর পায়। বিক্রমের ছেলে ইয়াইফাবা তাকে দ্রুত হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর পুলিশ আটজনকে আটক করেছে। তাদের মধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং একজন নাবালককে আটক করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ভরত কুমার (১৯), প্রমোদ (২৬), রমজান খান (২২), দীপাংশু (২১), মোহন বিশ্বকর্মা (৩২), বিজয় (৩৬) ও মান্নু (২৬)। পুলিশ জানিয়েছে, তারা বিভিন্ন ধাবা ও খাবারের দোকানে কাজ করেন।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার পর দিল্লিতে বসবাসকারী উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় এক নারী, যিনি নিজেও মণিপুরের বাসিন্দা এবং একই ভবনের দোতলায় থাকেন তিনি বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের প্রায়ই বর্ণবিদ্বেষের শিকার হতে হয়।
তিনি বলেন, ‘অনেকেই আমাদের চাইনিজ বা মোমো বলে ডাকে। আমরা ভারতীয় এবং এর জন্য আমরা গর্ববোধ করি। অন্যেরা কেন আমাদের ভারতীয় বলে মনে করে না?’
রোববার রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওই নারী বলেন, তিনি কয়েকজনকে একজন ব্যক্তিকে ধাওয়া করতে দেখেছিলেন। অন্ধকারের কারণে হামলাকারীদের পরিচয় বুঝতে পারেননি। তাদের গালিগালাজের শব্দ শুনে ভয়ে তিনি নিজের দরজা বন্ধ করে দেন।
বিক্রম সম্পর্কে ওই প্রতিবেশী বলেন, তিনি অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ ছিলেন। কখনো জোরে কথাও বলতেন না। বিক্রম প্রায় নয় বছর ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছিলেন।
আরেক প্রতিবেশী বলেন, ‘জোরে শব্দ ও মদ্যপানের প্রতিবাদ করার জন্য আরও একজন ভারতীয় ভাইকে এভাবে খুন হতে হলো—এটা ভেবে এলাকার বাসিন্দারা গভীরভাবে বিচলিত।’
হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দা এবং দিল্লিতে বসবাসকারী উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ মোমবাতি মিছিল করেছেন।
বিক্রমের মৃত্যুতে মণিপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও শোক নেমে এসেছে। ইম্ফলভিত্তিক গায়ক আখু চিংগামবাম তাকে তার দেখা অন্যতম সেরা গিটারবাদক হিসেবে উল্লেখ করে শোক প্রকাশ করেছেন।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নর্থ ইস্ট স্টুডেন্টস সোসাইটি (নেসডু) বিক্রমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি তাঁকে একজন সম্মানিত মণিপুরী সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এ ঘটনায় রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভারতের লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, দেশের রাজধানীতে উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নিজের দেশের রাজধানীতে নিজের বাড়ির সামনে একজন বাবার এভাবে নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে বিক্রমকে হত্যার পেছনে হামলাকারীদের কোনো বর্ণবিদ্বেষী উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে দিল্লি পুলিশ। একই সঙ্গে মদ্যপান ও উচ্চ শব্দের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করেই হামলার সূত্রপাত হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

