সকালে হোটেলের জানালার পর্দা টানতেই মনটা ভালো হয়ে গেল। পরিষ্কার ঝকঝকে রোদে ঝলমল চারধার। পরিষ্কার আকাশ। সূর্যের কিরণে সব শঙ্কা যেন কেটে গেল—খেলা তাহলে হচ্ছে! দুদিন পর নাগোয়ার আকাশে রোদের দেখা মিলল। বৃষ্টি তাহলে ছুটি পেল। ক্রিকেটের সময় শুরু হলো।
আগের রাতেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ম্যানেজার নাফিস ইকবাল জানিয়েছিলেন, বুধবার সকাল ৯টা থেকে অনুশীলন শুরু হবে। আগের দুদিন বৃষ্টির কারণে যথাযথ অনুশীলন হয়নি। মঙ্গলবার তো ক্রিকেট দল মাঠেই যায়নি! দিনভরের বৃষ্টিতে মালয়েশিয়ার বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ মাঠে গড়ায়নি। র্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকার সুবিধায় বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে।
আজ সেই সেমিফাইনাল। প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। যে পাকিস্তানও কোনো ম্যাচ না খেলে সেমিফাইনালে নাম লিখিয়েছে। বুধবার আইচি-নাগোয়ার খারোগি অ্যাথলেটিক পার্কে বাংলাদেশ দল ঠিক সকাল ৯টায় পৌঁছালেও অনুশীলন শুরু হতে খানিকটা বিলম্ব হলো। কারণ অনুশীলন নেট বাংলাদেশ দলকেই ঠিকমতো করে প্রস্তুত করে নিতে হলো। নেটে ব্যাটাররা অনুশীলন করলেন। মূল মাঠে বোলাররা বোলিং করলেন। ক্যাচিং অনুশীলনও চলল বেশ সময় নিয়ে। গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়েও ঝালাই কর্ম চলল। ক্রিকেটাররা মাঠের একপাশে অনুশীলন করছিলেন আর মূল উইকেট এবং ডাগআউটের কাছাকাছি থাকা মাঠের অংশে তখন মাঠ কর্মীরা পরিচর্যার কাজ সামাল দিচ্ছিলেন। এই মাঠের কিউরেটর গামাগি পুরোটা সময় মাঠকর্মীদের সঙ্গে ব্যস্ত রইলেন। মাঠের এক কোনার ভেজা অংশটাই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। এর আগে নারী দলের সঙ্গে চিনের ম্যাচটা মূলত বাতিল হয়েছিল এই অংশটা ভেজা থাকায়। আজকের সেমিফাইনালের আগে যাতে সেই অংশটাই ফের কোনো সমস্যার তৈরি না করে সেদিনেই মাঠকর্মীদের মনোযোগ বেশি ছিল। রোলার, স্পঞ্জ এবং সুপার সাপারের দাপাদাপি চলল বাংলাদেশ দলের অনুশীলন পর্বের পুরোটা সময়।
খেলার জন্য মাঠ তৈরিতে মাঠকর্মীদের তৎপরতা জানাচ্ছিল আজকের সেমিফাইনাল যাতে নির্ভেজালভাবে হোক—সেটা সবার চাওয়া। আর সেই চাওয়াটা সবচেয়ে বেশি যে বাংলাদেশ দলের। এশিয়ান গেমসে পদক নিয়ে বাড়ি ফিরতে হলে আজকের সেমিফাইনাল বাংলাদেশকে জিততেই হবে। বৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে ম্যাচ না হলে উন্নততর র্যাংকিংয়ের সুবিধায় পাকিস্তান পৌঁছে যাবে ফাইনালে। ম্যাচ জেতার একটা চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ নিতে চায়। না খেলে যদি গেমস থেকে বিদায় নিতে হয়—তাহলে নিশ্চিত জাপানের বৃষ্টি বাংলাদেশ দলের অভিশাপ পাবে!
তবে দলের টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে ক্রিকেটার সবাই আশাবাদী যে বুধবারের মতো আজ ম্যাচের সকালেও আকাশ রোদ ঝলমল থাকবে। অনুশীলন শেষে সাংবাদিকদের এসে সেই প্রত্যাশার কথাই জানালেন দলের লোয়ার অর্ডার ব্যাটার ইয়াসির আলী রাব্বী—‘জাপানে আসার পর আজই প্রথম রোদ দেখলাম। ভালো লাগছে, আজ প্রথম আমরা মাঠে নামতে পেরেছি। কালকেও (ম্যাচের দিন) ইনশাআল্লাহ রোদ থাকবে, আশা করি খেলার জন্য ভালো আবহাওয়া থাকবে।’
কোয়ার্টার ফাইনাল হয়নি। মাত্র এক দিন হালকা চালে সামান্য ক্রিকেট অনুশীলন হয়েছে। আরেক দিন পাশের ফুটবল মাঠে ফুটবল খেলেই সময় কেটেছে দলের। কারণ সেই মাঠে যে নেট সুবিধা ছিল না। ইনডোরে অনুশীলনের কোনো সুবিধাও নেই এই গেমসে। এমন পরিস্থিতিতে আজ পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে খেলতে নামছে বাংলাদেশ। পুরো দলের ক্রিকেটীয় ফোকাসে এটি বড় কোনো সমস্যা হলো কি না, এই প্রশ্নের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হলেন না ইয়াসির আলী রাব্বী। বললেন, ‘আবহাওয়ার পরিস্থিতির কারণেই আমাদের তেমন অনুশীলন হয়নি, তবে সব সময় নিজেদের মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখি আমরা। এর আগে আমাদের জিম সেশন ছিল, করতে পারিনি তবে মাঠে এসেছি আমরা। হালকা অনুশীলন করেছিল, ফুটবল খেলেছি। যতটুকু পেরেছি, নিজেদের মানসিকভাবে প্রস্তুত রেখেছি। হোটেলে টিম মিটিং হয়েছে। পরিকল্পনা হয়েছে। পুরো দলের সবাই জানে কার কী কাজ।’
দল মাঠে নামার আগেই ব্যাটার নাজমুল হোসেন শান্তকে দেশে ফিরে যেতে হয়েছে। অসুস্থতার জন্য জাপানে এসে দলের সঙ্গে মাঠে যাওয়ার আগেই অসুস্থ হয়ে পড়েন শান্ত। জ্বরে আক্রান্ত হন। পরে টিম ম্যানেজমেন্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করে তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। মিডল অর্ডারে শান্তর মতো একজন ইনফর্ম ব্যাটারকে কি বাংলাদেশ মিস করবে? শান্তর এভাবে ফিরে যাওয়া প্রসঙ্গে তার সতীর্থ ইয়াসির বলেন, এটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। ও অসুস্থতার কারণে চলে যাচ্ছে। কিন্তু যেটা হয়ে গেছে, সেটা হয়ে গেছে। আমাদের ফোকাস করা উচিত সামনের দিকে। ব্যাটিং অর্ডারে যা আছে, তাই নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
খারোগি অ্যাথলেটিক স্পোর্টস পার্কে নারী দলের ক্রিকেটে বড় স্কোরের ম্যাচ হয়েছে। বাংলাদেশ দলও ভালোই জানে আজ পাকিস্তানকে হারাতে হলে তাদের বড় রান করতে হবে। এমন উইকেটে টসে জিতে আগে ব্যাটিংই করতে চাইবে যেকোনো দল। কিন্তু সমস্যা হলো পেছনের তিন দিনের বৃষ্টিতে ঢেকে রাখা উইকেটের চরিত্রে কোনো বদল আসে কি না—সেটাও এখন দেখার বিষয়।
ইয়াসির উইকেট প্রসঙ্গে নিজের মতামতে বললেন, ‘উইকেট দেখেছি। ভালো উইকেট মনে হয়েছে। আশা করি আমরা ভালো ক্রিকেট খেলব।’
টি-টোয়েন্টিতে পাকিস্তান বরাবরই শক্তিশালী দল। এই পাকিস্তান দলও বেশ ভারসাম্যপূর্ণ। বোলিংয়ে বেশ বৈচিত্র্য আছে। সবমিলিয়ে একাদশে তাদের বোলিং অপশন সাতটি! প্রতিপক্ষ হিসেবে পাকিস্তান প্রসঙ্গে ইয়াসির বলেন, ‘আমি ওদের নড়বড়ে দল বলব না। ওরা অনেক ভালো দল। ক্রিকেটে যখন আমরা মাঠে নামি, সবাই ভালো দল। যে ভালো খেলবে, সে জিতবে। আমরা আমাদের সেরাটা দিয়ে খেলব। আমাদের ইতিবাচক ক্রিকেট খেলতে হবে। বাকিটা উইকেট এবং আবহাওয়ার ওপর বিবেচনা করে খেলতে হবে।’
আবহাওয়া—সেটাই যেন নাগোয়ায় বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ না হয়!
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


