স্টেডিয়াম পরিচ্ছন্নতায় ধান্দাবাজি

বিল ৬৫০ হলেও কর্মী পান ৩০০ টাকা, বিসিবির দালালের পকেটে যায় ৩৫০!

স্পোর্টস রিপোর্টার

বিল ৬৫০ হলেও কর্মী পান ৩০০ টাকা, বিসিবির দালালের পকেটে যায় ৩৫০!

মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ওয়াশরুম নিয়ে দর্শকদের অভিযোগ বেশ পুরোনো। গত শনিবার বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড তৃতীয় টি-টোয়েন্টি চলাকালে গ্যালারিতে গিয়ে দর্শকদের কাছ থেকে সরাসরি অভিযোগ শোনেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল। দর্শকদের খেলা দেখার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিকার নিয়ে কাজ করছেন বিসিবি সভাপতি। সেই কাজ করতে গিয়েই জানতে পারেন বিসিবি থেকে প্রত্যেক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জন্য ৬৫০ টাকা বরাদ্দ থাকলেও নানাভাবে তা হাতবদলের পর সেসব কর্মী পাচ্ছেন মাত্র ৩০০ টাকা। বিসিবির অ্যাডহক কমিটির প্রধান তামিম ইকবাল নিজেই সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

স্টেডিয়ামের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম কেন সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে নাÑসেই ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে ‘দালালের’ ব্যাপারটি খুঁজে পান তামিম ইকবাল। টেন্ডারের মাধ্যমে ক্লিনিং সার্ভিস ব্যবহার করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ করে বিসিবি। তবে এখানেই আছে দালালের ফাঁদ। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয় না। বরং টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ পাওয়া তৃতীয় পক্ষ বিসিবি কর্মচারীর মাধ্যমে নিয়োগ পান পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। এর ফলে বিসিবির নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাই সিরিজ চলাকালে হয়ে যান তৃতীয় পক্ষের লোক। দুই দফা এই হাতবদলের ফলে বিসিবি থেকে বরাদ্দ প্রতি পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রতিদিন ৬৫০ টাকা হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে পৌঁছায় ৩০০ টাকা!

বিজ্ঞাপন

এ নিয়ে গতকাল তামিম ইকবাল বলেন, ‘এখন যা হচ্ছে, টেন্ডার একটি কোম্পানি পাচ্ছে। বিসিবিরই লোকজন ৩০-৪০ জন ক্লিনার দিচ্ছে। আর ওই কোম্পানি টাকাটা বিসিবি থেকে নিয়ে বিসিবির লোকজনকে দিচ্ছে। আবার ওই টাকা নিয়ে তারা তাদের মতো করে ক্লিনারদের দিচ্ছে। এর থেকে যার যার লাভ, সেটা রেখে দিচ্ছে।’

বিসিবি ৬৫০ টাকা বরাদ্দ করলেও টেন্ডার পাওয়া প্রতিষ্ঠান পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রতি ৫০০ টাকা দেয়। ওই টাকা সরাসরি পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পান না। বরং টেন্ডার পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী সরবরাহ করা বিসিবির কর্মচারী পান সেই টাকা। সেখান থেকে দালাল হিসেবে কাজ করা বিসিবির ওই কর্মচারী জনপ্রতি ২০০ টাকা রেখে বাকি ৩০০ টাকা দেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের।

টেন্ডারের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠান ১৫০ টাকা লাভ করে বাকিটা কর্মীদের দিতে পারে। এটাই হওয়া উচিত বলে মনে করেন তামিম ইকবাল। টেন্ডারের মাধ্যমে কাজের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠান ১৫০ টাকা লাভের পরও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ৩০০ টাকা করে কেন পাচ্ছেনÑসে ব্যাখ্যায় ওই প্রতিষ্ঠান তামিমকে জানায়, ৫০০ টাকা থেকে আরো ২০০ টাকা নিজেদের কাছে রেখে দেন বিসিবির কর্মী।

এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ধরলাম ৬৫০ টাকা থেকে পার পারসন ১৫০ টাকা লাভ করতে পারেন, এতে নানা খরচ থাকতে পারে। কিন্তু ওই মহিলাগুলো তো (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) ৫০০ টাকা করে পেতে পারেন। টেন্ডার পাওয়া প্রতিষ্ঠান আমাকে জানিয়েছে, আমরা ৫০০ টাকা করেই দিই। বিসিবির অমুককে দিই। অমুককে দেওয়ার পর তিনি আবার পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ৩০০ টাকা করে দেন। মাঝখানে ২০০ টাকা করে বিসিবির ওই কর্মী খাচ্ছেন।’

অর্থাৎ, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের এই টাকা মেরে দেওয়ার ‘দালালচক্র’ বাইরের কেউ নয়, বিসিবিরই লোক!

এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তামিম ইকবাল বলেন, ‘আমার কষ্ট হয় এই মহিলাগুলো যারা ৩০০-৪০০ টাকা প্রতিদিন আয় করে, এদের থেকেও টাকা খেতে হবে! মানে, এদের থেকেও টাকা চুরি করতে হবে? দিস ইজ অ্যাবসলিউটলি ননসেন্স।’

তবে ‘দালালির’ মাধ্যমে টাকা চুরির ব্যাপারটি সামনে আসায় দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল। তিনি ক্লিনিং সার্ভিসের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছেন জনপ্রতি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পুরো ৫০০ টাকা করে পারিশ্রমিক দিতে। সবশেষ নিউজিল্যান্ড সিরিজে প্রত্যেক পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে ৫০০ টাকা করে পারিশ্রমিক পরিশোধের পর বিল জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া বিসিবির নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়োগ না করে নিজেদের মতো করে লোক নিয়োগের নির্দেশনাও দিয়েছেন তামিম।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পারিশ্রমিক বিসিবি সভাপতির সামনেই পরিশোধ করার নির্দেশনাটাও ছিল তার পক্ষ থেকে। এ নিয়ে তামিম বলেন, ‘আমি বলেছি আপনি ৩০ জন মহিলাকে ডাকবেন। আমার সামনে তাদের ৫০০ টাকা করে দেবেন। ১০০ বা ১৫০ টাকা আপনার লাভ থাকতেই পারে। কারণ, যদি কোনো কোম্পানি একটি কাজ নেয়, তার অনেক কিছু কেনা লাগে। তার নিজস্ব কোম্পানি চালাতে হয়, তারা একটু লাভ করবেই। কিন্তু যে কথা আপনি ওই মহিলাগুলোকে দিয়েছেন, তা পূরণ করতেই হবে।’

এছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওভারটাইম নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মও ধরা পড়েছে তামিমের কাছে। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘ওভারটাইমটা ওদের (পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের) অ্যাকাউন্টেই যায়। কিন্তু ওখান থেকে বের করে আবার ওই মহিলাগুলো ওই লোকটিকে (বিসিবির দালাল) দিয়ে দিচ্ছেন। আমি এর প্রত্যেকটি বিষয় খুবই শক্তভাবে মনিটর করছি।’

পরে যেন এ ধরনের কোনো কিছু না ঘটে, সেদিকে গভীর মনোযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানান তামিম ইকবাল। তার কথায়, ‘আমি থাকতে বিন্দুমাত্র ছাড় নেই। এক শতাংশও ছাড় হবে না। আপনারাও এ বিষয়গুলো তুলে ধরবেন, যাতে পরবর্তীতে কোনো কোম্পানি এসে টেন্ডারে কাজ পেয়ে এ ধরনের দুই নম্বরি না করতে পারে।’

ক্লিনারদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকাও খায় বিসিবির দালাল! এসব ‘দালাল’ আবার বাইরের কেউ নয়, বিসিবিরই লোক! অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই ধান্দাবাজির ধরন ও চলন বেশ পুরোনো। আগের বিসিবিও এই অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে। কিছু অসৎ ও অর্থলোভীর কারণে বিসিবি এখন অনেক কিছুতেই প্রশ্নবিদ্ধ। এই লোভী ও ধান্দাবাজরা দিনমজুরি করা ক্লিনিং স্টাফদের কষ্টার্জিত টাকাও লুটে নিয়েছে!

এখন জানার বিষয় হলো, গরিবের হক কেড়ে নেওয়া এই দালালদের নাম প্রকাশ করার সাহস বিসিবি দেখাবে কী?

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন