আব্রাহাম লিংকনে ৩০ নাবিকের আত্মহত্যার চেষ্টা, দাবি সাবেক সিআইএ বিশ্লেষকের

আব্রাহাম লিংকনে ৩০ নাবিকের আত্মহত্যার চেষ্টা, দাবি সাবেক সিআইএ বিশ্লেষকের

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে প্রায় ৩০ জন নাবিক আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলে দাবি করেছেন সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক ল্যারি জনসন। তার দাবি, দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনীতে খাবার, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসামগ্রী, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও মনোবল—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার রাতে আল মায়াদিনের ‘দ্য গ্রেট স্ট্যান্ডঅফ: ইরান অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ অনুষ্ঠানে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মারান্দির সঙ্গে আলোচনায় এসব কথা বলেন জনসন। তিনি মনে করেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইরানই বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।

জনসন বলেন, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে ছয়জন নাবিক পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন—এমন একটি সংবাদ প্রকাশিত হলেও সম্প্রতি অবসর নেওয়া এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তার কাছ থেকে তিনি ভিন্ন তথ্য পেয়েছেন। ওই কর্মকর্তার মতে, প্রকৃত সংখ্যা ছয়ের কাছাকাছি নয়, বরং প্রায় ৩০ জন হতে পারে। তার দাবি, মার্কিন নৌবাহিনী ছাড়াও সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখায় মনোবল ও আত্মহত্যা-সংক্রান্ত উদ্বেগ রয়েছে।

অস্ত্র ও সরবরাহ সংকটেও চাপ বাড়ছে

জনসনের মতে, শুধু জনবলের মনোবল নয়, উন্নত অস্ত্রের মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও যুক্তরাষ্ট্র ক্রমবর্ধমান সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে। তিনি দাবি করেন, টমাহক ও জেএএসএসএম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টর এবং থাড ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের ক্ষেত্রে চীনের সরবরাহব্যবস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা রয়েছে।

তার দাবি, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রায় ৮০ শতাংশ মার্কিন অস্ত্রব্যবস্থা কোনো না কোনোভাবে চীনা সরবরাহ চেইনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ইরানের আশপাশে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীকে সরবরাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে নৌবাহিনীর সক্ষমতাও গত এক দশকে কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাহরাইন ও ওমানে মার্কিন বাহিনীর সরবরাহকেন্দ্রে ইরানি হামলা পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করেছে বলেও দাবি করেন জনসন। এসব কারণে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে এবং ইরানের পক্ষে যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা

অধ্যাপক মারান্দিও মনে করেন, দীর্ঘ যুদ্ধের ধকল সহ্য করার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি হতে পারে। তার মতে, ইরান নিজেকে বহিরাগত আগ্রাসনের শিকার হিসেবে দেখছে, ফলে দেশটির জনগণের মধ্যে যুদ্ধের প্রতিকূলতা মোকাবিলার প্রবণতা শক্তিশালী হতে পারে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত আরো জোরালো হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গ্যাসোলিন, ডিজেল ও উড়োজাহাজের জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব মার্কিন অর্থনীতিতে পড়বে বলেও সতর্ক করেন মারান্দি।

জনসন স্ট্রেইট অব হরমুজের পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরেন। তার মতে, ওই নৌপথে বিঘ্নের কারণে ডিজেল ও বিমান জ্বালানির সংকট তৈরি হতে পারে এবং কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও তা দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

ইরান আরো আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাচ্ছে?

মারান্দির মতে, ইরান এখন প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের পাশাপাশি আরো আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি মেজর জেনারেল মোহসেন রেজাইয়ের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফেরাকে এর একটি ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেন।

জনসনও রেজাইয়ের সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ওয়াশিংটনের উচিত তার নতুন ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। মারান্দি বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতাগুলো কাজে লাগাতে চায় এবং অঞ্চলজুড়ে মার্কিন কৌশল ব্যর্থ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

রাশিয়া-চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে শক্তি হিসেবে দেখছেন জনসন

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে দেশটির অর্থনীতি ধসিয়ে দেওয়ার মার্কিন ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন জনসন। তার মতে, জেসিপিওএ চুক্তির সময়ের তুলনায় বর্তমানে ইরান অনেক কম বিচ্ছিন্ন। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব, পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং কাস্পিয়ান সাগর ও ইউরেশিয়াভিত্তিক পরিবহনপথ তেহরানকে বিকল্প অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে।

হরমুজ নিয়ে ইরান-ওমান সমঝোতা

স্ট্রেইট অব হরমুজ পরিচালনা নিয়ে ইরান ও ওমানের সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়েও আলোচনা করেন দুই বিশ্লেষক। জনসন মনে করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওমানকে দেওয়া হুমকি দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছানোর ইঙ্গিত হতে পারে।

তবে মারান্দির মতে, যুদ্ধ চলাকালে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি হলেও তার বাস্তব প্রভাব সীমিত থাকবে। তিনি বলেন, ইরান জলপথটির ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে এবং পারস্য উপসাগরে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের কাছ থেকে ফি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

আলোচনায় মারান্দি রয়টার্সের কিছু প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। পাশাপাশি উত্তর ইরাকে সাম্প্রতিক হামলার জন্য ইরান দায়ী—এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, তেহরান ওই হামলার দায় অস্বীকার করেছে এবং ইরান সাধারণত কোনো হামলা চালালে তার দায়িত্ব স্বীকার করে।

সূত্র: আল মায়াদিন

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন