বিকল্প জ্বালানিতেই মুক্তি দেখছে সরকার ও বেসরকারি খাত


বিকল্প জ্বালানিতেই মুক্তি দেখছে
সরকার ও বেসরকারি খাত

দেশে বিদ্যমান গ্যাসকূপগুলো পুরোনো হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন দিনদিন কমেই চলেছে। নতুন কূপ খনন এবং উত্তোলনেও বড় কোনো সুসংবাদ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে গ্যাস-বিদ্যুৎ আমদানির জন্য উপযুক্ত কোনো উৎসের সন্ধানও মিলছে না। এমতাবস্থায় দেশব্যাপী চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিরসন এবং সামনের বছরগুলোয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিকল্প জ্বালানিতেই মুক্তি দেখছেন সরকার এবং বেসরকারি উদ্যোক্তারা।

বিজ্ঞাপন

এ লক্ষ্যে কয়লা, খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে সূর্যরশ্মি, বাতাসের গতিবেগ, গৃহস্থালির বর্জ্য এবং পশুর মলমূত্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান এক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করলেও উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাবে বাংলাদেশ রয়ে গেছে অনেক পেছনে। এমতাবস্থায় উৎপাদন সক্ষমতায় বিকল্প জ্বালানির বর্তমান অবস্থান ৫-৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ করার লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ এবং একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে সরকার। সরকারের এ পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে বাস্তবায়নে এগিয়ে আসছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারাও।

বিকল্প জ্বালানি কী

কয়লা, খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের বাইরে সূর্যের আলো, বাতাসের গতি, পানির প্রবাহ, গৃহস্থালি বর্জ্য, পারমাণবিক শক্তি কিংবা মাটির গভীরে জমে থাকা তাপকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যেসব উৎস থেকে জ্বালানি ব্যবহার করা হয় তা-ই বিকল্প জ্বালানি। এগুলোর মধ্যে সূর্যরশ্মিকে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তর, উইন্ড মিল বা বায়ুকলের সাহায্যে বাতাসের গতিবেগকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নদীর পানির স্রোত বা বাঁধের পানি ব্যবহার করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি, গৃহস্থালির বর্জ্য, পশুর মলমূত্র বা গাছের পাতা পচিয়ে তৈরি গ্যাস ও শক্তি এবং মাটির নিচের তাপকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদিত শক্তিকে বলা হয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি। আর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো পরমাণুর ফিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করাকে ধরা হয় অনবায়নযোগ্য কিন্তু পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানি হিসেবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসগুলো কখনো শেষ হয়ে যায় না বরং প্রকৃতি থেকে বারবার তৈরি হয়। এসব উৎস ব্যবহার করলে পরিবেশের ক্ষতি কম হয় এবং যা সনাতন জ্বালানির বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। খনিজ জ্বালানি পোড়ালে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায়, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের দাম প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে। কিন্তু বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমে ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়। কয়লা বা গ্যাস একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু সূর্য বা বাতাসের মতো প্রাকৃতিক উৎসগুলো চিরকাল থাকবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্বল বাংলাদেশ

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল ও ভুটান বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশবান্ধব ও বিকল্প শক্তির ব্যবহারের দিক থেকে বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভুটানে উৎপাদিত বিদ্যুতের শতভাগ আসে বিকল্প উৎস, প্রধানত জলবিদ্যুৎ থেকে। নেপালে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৯৯.৭০ শতাংশ আসে বিকল্প বা নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৫১.৫০ শতাংশ মেটানো হয় বিকল্প উৎস থেকে, যার মধ্যে জলবিদ্যুৎ, সৌরশক্তি ও বায়ুবিদ্যুৎ অন্তর্ভুক্ত। জলবিদ্যুৎ ও বায়ো-এনার্জি থেকে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ২৪ থেকে ২৮ শতাংশ আসে পাকিস্তানে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই উদ্বেগজনক। বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ১,১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে। জাতীয় চাহিদার বিপরীতে প্রকৃত সরবরাহের দিক থেকে বিকল্প জ্বালানি অবদান মাত্র ৩-৪ শতাংশ । যদিও বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি আহরণের সক্ষমতা অনেক বেশি।

সক্ষমতা ১,৮২৫.৮ মেগাওয়াট

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (শ্রেডা) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডভুক্ত এবং গ্রিডের বাইরে মিলিয়ে ১,৮২৫.৮ মেগাওয়াট বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি আহরণের সক্ষমতা রয়েছে। এটি দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫.৪ থেকে ৫.৬ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ১,১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর মধ্যে সৌরশক্তি থেকে উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে সর্বোচ্চ ১,৫২৯.১০ মেগাওয়াট।

দেশের বিকল্প জ্বালানির প্রায় ৮৩ ভাগই আসে সৌরশক্তি থেকে। এর মধ্যে সোলার পার্ক বা বড় বাণিজ্যিক প্রকল্প থেকে ৭৪৫.২৫ মেগাওয়াট, কারখানার ছাদ থেকে ৩৩৯.৯৮ মেগাওয়াট, গ্রামীণ গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে ২৬৩.৬৫ মেগাওয়াট, সেচ পাম্প থেকে ৫৮.৯৭ মেগাওয়াট এবং রাস্তার বাতি, টেলিকম টাওয়ার ইত্যাদি উৎস থেকে ১২১.২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। রাঙামাটির কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বর্তমানে ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা দেশের অন্যতম পুরোনো ও বড় পরিবেশবান্ধব শক্তির উৎস। কক্সবাজারের খুরুশকুলে দেশের প্রথম বড় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বর্তমানে অন-গ্রিডে ৬২ মেগাওয়াট বায়ুশক্তি যুক্ত হচ্ছে।

এছাড়া বায়োগ্যাস ও বায়োমাস থেকে ১.০৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বর্তমানে রয়েছে। যদিও বর্তমানে মোট সক্ষমতার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ আহরণ বা উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২,৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা চালু হলে দেশের বিকল্প জ্বালানির চিত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশে বর্তমানে ক্যাপটিভসহ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩২ হাজার ৪৭৬ মেগাওয়াট। জাতীয় চাহিদার বিপরীতে প্রকৃত সরবরাহের দিক থেকে বিকল্প জ্বালানি অবদান রাখছে মাত্র ৩-৪ শতাংশ।

২০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা

২০৩০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদনের ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ বিকল্প উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ এবং একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে সরকার। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অন্তত ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন হবে। এজন্য দেশে জমির স্বল্পতার পরিপ্রেক্ষিতে জমি-নির্ভর বড় প্রকল্পের চেয়ে অবকাঠামো ও অর্থায়নের বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিয়ে ৫টি প্রধান কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা করা হয়েছে শিল্পকারখানা ও সরকারি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু রুফটপ সোলার থেকেই ৫,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের। এজন্য সব সরকারি অফিস, স্কুল, মাদরাসা এবং হাসপাতালের ছাদে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বিনামূল্যে সোলার প্যানেল বসানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা নিজস্ব খরচে সোলার প্যানেল বসাবেন এবং পরিচালনা করবেন। ভবন কর্তৃপক্ষ বা কারখানা মালিকরা সস্তায় সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন।

এছাড়া অব্যবহৃত সরকারি খাস জমি এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ৪,৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বড় সোলার পার্ক করা হবে। বড় জলাশয় বা হ্রদের পানিতে ভাসমান সোলার প্যানেল এবং কৃষিজমি রক্ষা করে প্যানেলের নিচে চাষাবাদের বিশেষ প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো হবে। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডকে আধুনিক করা হচ্ছে যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওঠানামা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দিনের উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ বড় ব্যাটারিতে জমা রেখে রাতে ব্যবহার করার জন্য ব্যাটারি স্টোরেজ অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।

বিকল্প জ্বালানিতে ব্যাপক বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে দেওয়া হচ্ছে বড় ধরনের আর্থিক ছাড়। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের পাওনা সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করতে স্থগিত থাকা পেমেন্ট গ্যারান্টি ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হয়েছে। নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রথম ১০ বছর সম্পূর্ণ করপোরেট কর মওকুফ এবং পরবর্তী পাঁচ বছর আংশিক কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল থেকে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে রুফটপ সোলারের জন্য বিশেষ সবুজ ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি আমদানিতে কমানো হয়েছে শুল্ক-কর।

বাতিল প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাই

বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে কোনো রকম প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই অনুমোদিত মোট ৩৯টি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে ৩৪টি ছিল সৌরবিদ্যুৎ (বিকল্প জ্বালানি) প্রকল্প এবং বাকি পাঁচটি ছিল গ্যাসভিত্তিক প্রকল্প। বাতিল হওয়া ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প থেকে ৩,৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, যার সিংহভাগই ছিল সৌরশক্তি এবং প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং মোকাবিলার লক্ষ্যে ড. ইউনূসের আমলে বাতিল করা ওই ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প পুনরায় যাচাই-বাছাই করে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে গত ৬ মে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি সূত্রে জানা গেছে, ঢালাওভাবে সব প্রকল্প বাতিল না করে সেগুলোর বর্তমান বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

যে কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে জমি কিনে ফেলেছে বা অর্থায়নের ব্যবস্থা করে কাজের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সচল করা হবে। এতে থমকে থাকা প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ ও চুক্তিগুলো রক্ষায় আইনি জটিলতা কাটানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। তবে যেসব প্রকল্পে দুর্নীতি-অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে। শুধু সেগুলোই স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হতে পারে।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ

জানা যায়, দেশে বর্তমানে ৫,০০০-এর বেশি প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৪১ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ১০ গুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে নেট মিটারিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য গ্রাহকদের ন্যায্য প্রণোদনা প্রদানের উদ্যোগের কথা জানানো হয়। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন মাত্রা যোগ করতে ইউনিটপ্রতি ১০.০৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০.৫০ পয়সা দর নির্ধারণ করেছে সরকার।

ভবনের মালিক ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে স্থাপনা করার সুযোগ রেখে

আগামী গ্রীষ্মের মধ্যে ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জনগণকে উৎসাহিত করতে বিতরণ কোম্পানিগুলো ভর্তুকি আকারে প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। দেশব্যাপী সার্ভিস প্রোভাইডার তালিকাভুক্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বিতরণ সংস্থাগুলো। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, তরুণ, নারী উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।

নেট মিটারিংয়ে গুরুত্বারোপ

বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে নেট মিটারিং পদ্ধতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (শ্রেডা)। এ প্রক্রিয়ায় একজন গ্রাহক একাধারে বিদ্যুতের একজন ভোক্তা এবং উৎপাদনকারী হিসেবে কাজ করেন। শিল্পকারখানা বা বাড়ির মালিক তার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করবেন। দিনে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ প্রথমে তার নিজস্ব যন্ত্রপাতি বা বাতি চালাতে ব্যবহার করবেন। ছুটির দিনে বা কারখানায় ব্যবহার কম থাকলে, প্যানেলের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেসকো, ডিপিডিসি বা পল্লী বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডে চলে যাবে।

এই ব্যবস্থায় সাধারণ মিটারের বদলে একটি দ্বিমুখী বা স্মার্ট মিটার বসানো হবে। মিটারই হিসাব রাখবে গ্রাহক গ্রিড থেকে কত ইউনিট বিদ্যুৎ নিলেন আর গ্রিডকে কত ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ দিলেন । মাস শেষে গ্রিড থেকে নেওয়া মোট ইউনিট থেকে গ্রিডে দেওয়া ইউনিট বিয়োগ করা হবে এবং গ্রাহক শুধু অবশিষ্ট ইউনিটের বিল পরিশোধ করবেন। আগে অনুমোদিত লোডের মাত্র ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সোলার প্যানেল বসানো যেত। এখন গ্রাহক তার অনুমোদিত বিদ্যুৎ লোডের শতভাগ সক্ষমতার সোলার সিস্টেম বসাতে পারবেন। আগে শুধু থ্রি-ফেজ বা বড় বাণিজ্যিক লাইনে এটি সম্ভব ছিল। এখন থেকে সাধারণ বাসাবাড়ির সিঙ্গেল ফেজ লাইনেও নেট মিটারিং সুবিধা পাওয়া যাবে।

বর্তমানে প্রি-পেইড এবং ডিজিটাল স্মার্ট মিটার ব্যবহারকারীরাও এই সিস্টেমের আওতায় আসতে পারবেন। তিন মাস পরপর যদি দেখা যায় গ্রাহক ব্যবহারের চেয়ে গ্রিডে বেশি বিদ্যুৎ দিয়েছেন, তবে সেই অতিরিক্ত ইউনিটের মূল্য ১০.৫০ টাকা হারে সরাসরি গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে জানিয়ে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (শ্রেডা) সদস্য (যুগ্ম সচিব) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের প্রধান ড. আশরাফুল আলম আমার দেশকে বলেন, সরকার এ সংক্রান্ত কৌশলপত্র তৈরি করেছে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করতে নানামুখী প্রচার চালানো হচ্ছে।

সরকার রুফটপ সোলার এবং নেট মিটারিংয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান এই যুগ্ম সচিব। তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ কমাতে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি প্রভৃতি আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফল পাওয়া যাচ্ছে এবং বিকল্প জ্বালানি থেকে প্রতিদিনই এক থেকে দুই মেগাওয়াট করে বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।

বিকল্প জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ আমার দেশকে বলেন, সরকারের নতুন উদ্যোগ চলমান জ্বালানি সংকট নিরসনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ঘোষিত প্রণোদনার যথাযথ ব্যবহার হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকেই কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সরকারের পাইকারি দর প্রায় ১৩ টাকা, আর সৌর থেকে পাওয়া যাচ্ছে ১০.৫০ টাকায়। এতে ভবনের ছাদ ব্যবহারে উৎসাহ বাড়বে, বিনিয়োগ আসবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের ঘোষণা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চর্চার মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান থাকায় এ খাতের উদ্যোক্তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, ক্যাবল অপারেটর ও নেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের মতো ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুতের প্রসার ঘটানো সম্ভব। তিনি বলেন, তারা বিনিয়োগ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবেন এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে জমা দিয়ে মাস শেষে বিল আদায় করবেন। এর মাধ্যমে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকার সমানভাবে লাভবান হবেন।

অন্যদিকে নবায়নযোগ্য বিকল্প জ্বালানির ওপর সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত বলেছেন, আমরা রিনিউঅ্যাবল সোলার পলিসি করেছি, উদ্যোক্তাদের শুল্ক সুবিধা দিচ্ছি। এ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যে উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি হবে, তাতে যদি ন্যূনতম ৩,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি, তাহলে আগামী গ্রীষ্মে মানুষের কষ্ট কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। দূর হবে সংকট, দীর্ঘমেয়াদে জনমনে স্বস্তি ফিরে আসবে।

এমই

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন