সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে গতিশীলতা আনতে এবং ক্রয়ে দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প পরিচালকদের অর্থ ব্যয়ের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে এখন থেকে ক্রয় কমিটির অনুমোদন ছাড়াই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানভেদে দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত ব্যয় করার ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি অর্থ বিভাগ এ-সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে।
নতুন পরিপত্র অনুযায়ী মন্ত্রণালয়গুলোর উন্নয়ন কেনাকাটা এবং পরিচালন খাতে ব্যয়ের ক্ষমতা ৫০ কোটি টাকা থেকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ মন্ত্রীদের হাতে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই ভাবে পরিচালনার কাজেও ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবে মন্ত্রণালয়।
এছাড়া পিপিআর বিধিমালার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কেনাকাটার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতার স্পষ্টীকরণের জন্য কিছু নিয়মেরও পরিবর্তন করা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্রয় কমিটিতে অনুমোদন মনিটরিংয়ের একটি অংশ। এক্ষেত্রে টাকা বেশি খরচ করার সুযোগ দিলে বেশি দুর্নীতি হবে আর কম দিলে কম দুর্নীতি হবে। সরকার হয়তো এটা মাথায় রেখে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, কাজগুলো দ্রুত হবে। কিন্তু এটা নিশ্চিত করতে হলে অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, এটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত, তবে কেনাকাটার ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়াতে হবে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ আমার দেশকে বলেন, সময় বাঁচাতে এমন উদ্যোগ ইতিবাচক। বাজেটের আকার বেড়েছে, সে হিসাবে খরচ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ভালো। তবে এখানে যাতে অর্থের অপব্যবহার বা অপচয় না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি করতে হবে।
এর আগে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সরকারি সংস্থা, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সরকারি বা যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নকৃত প্রকল্পে ওই প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানপ্রধান একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটির অনুমোদন ছাড়াই ব্যয় করতে পারতেন। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের পরিপত্রের মাধ্যমে এ অর্থের পরিমাণ নির্ধারিত ছিল। সংবিধিবদ্ধ এসব সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের স্ব-অর্থায়নপুষ্ট প্রকল্পের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদনের আর্থিক ক্ষমতা এখন বাড়ানো হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুসারে যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পে মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত পূর্তকাজ বা নির্মাণ চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই ভাবে পণ্য, যন্ত্রপাতি ও মালামাল ক্রয়ের ক্ষমতাও এখন অনধিক ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের জন্য, যা আগে ৫০ কোটি টাকা ছিল। সেক্ষেত্রে ব্যয়ের ক্ষমতা বাড়ছে ১০০ শতাংশ।
পরিচালন বাজেটের আওতায় মন্ত্রণালয় পূর্তকাজের জন্য ১০০ কোটি এবং পণ্য ক্রয়ের জন্য ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় অনুমোদন করতে পারবে। এক্ষেত্রে পণ্য ক্রয়ে ক্ষমতা না বাড়লেও দ্বিগুণ করা হয়েছে পূর্তকাজের ব্যয় ক্ষমতা।
উন্নয়ন বাজেটে কোনো প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে মন্ত্রণালয় বা বিভাগের ব্যয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত, যা আগে ছিল ১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যয় ক্ষমতা বাড়ছে দ্বিগুণ।
এছাড়া মন্ত্রণালয়ের ভৌত সেবা অর্থাৎ ক্যাটারিং, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, মেরামত, পরিবহন সেবা ইত্যাদি কাজে এক সিদ্ধান্তে ব্যয়ের সীমা বাড়িয়ে ১৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
কোনো স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, করপোরেশন, সরকারি বা যৌথ মালিকানার কোম্পানি পরিচালনা পর্ষদ উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণ বা স্থাপনায় ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত নিজ সিদ্ধান্তে ব্যয় করতে পারবে। পরিচালন খাতের ক্ষেত্রেও এ ক্ষমতা ৩০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে ব্যয়সীমা আগের মতোই রয়েছে। পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে বোর্ড বা পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতা উন্নয়ন ও পরিচালন খাতে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। উন্নয়ন ও পরিচালন খাতে বোর্ড অনধিক আট কোটি টাকা পর্যন্ত পরামর্শক সেবার চুক্তি অনুমোদন করতে পারবে সংস্থাগুলোর পরিচালনা পর্ষদ। এক্ষেত্রেও আগের মতোই রাখা হয়েছে।
তবে পরিবর্তন আনা হয়েছে সংস্থার নির্বাহী প্রধানদের (ডিজি, চেয়ারম্যান বা সমপদমর্যার কর্মকর্তা) ব্যয় ক্ষমতায়। সংস্থার নির্বাহী প্রধান এককভাবে সর্বোচ্চ ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত পূর্তকাজের অনুমোদন দিতে পারবেন। আগে ছিল ২০ কোটি টাকা। এছাড়া পণ্য ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রধানের ক্ষমতা ২০ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা আগে ছিল সাত কোটি টাকা।
উন্নয়ন খাতের আওতায় নির্বাহী প্রধান অনধিক সাত কোটি টাকা পর্যন্ত পরামর্শক নিয়োগের চুক্তি অনুমোদন করতে পারবেন, যা আগে ছিল পাঁচ কোটি টাকা। পরিচালন বা অনুন্নয়ন খাতে নির্বাহী প্রধানের ক্ষমতা ২০১৫ সালের ১৫ কোটি টাকা থেকে সামান্য বাড়িয়ে ২০২৬ সালে ১৬ কোটি টাকা করা হয়েছে। পরিচালন খাতে পণ্য ক্রয়ের ক্ষমতা আগের মতোই আট কোটি টাকা অপরিবর্তিত রয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) কাজের গতি বাড়াতে তাদের আর্থিক ক্ষমতা তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। ‘ক’ শ্রেণির প্রকল্প পরিচালক (১০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প) পূর্তকাজের জন্য সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা, পণ্য ক্রয়ের জন্য ১০ কোটি টাকা এবং পরামর্শক সেবার জন্য পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত চুক্তি অনুমোদন করতে পারবেন। ‘খ’ শ্রেণির প্রকল্প পরিচালক (৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প) পূর্তকাজের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ কোটি টাকা, পণ্য ক্রয়ের জন্য পাঁচ কোটি টাকা এবং পরামর্শক সেবার জন্য তিন কোটি টাকা অনুমোদনের ক্ষমতা পেয়েছেন। ‘গ’ শ্রেণির প্রকল্প পরিচালককে (৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূল্যের প্রকল্প) পূর্তকাজের জন্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা, পণ্য ক্রয়ের জন্য তিন কোটি টাকা এবং পরামর্শক সেবার জন্য এক কোটি টাকা অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকদের ব্যয় ক্ষমতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

