জামালপুরের ইসলামপুরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্যশস্য’ (কাবিখা) প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দুই মাস আগে। তবে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। কোথাও আবার নামমাত্র কাজ করেই বরাদ্দের চাল-গম তুলে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কাবিখা কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ে ইসলামপুরে ৪৮ টন ৩২০ কেজি চাল এবং ৩৮ টন ৬৮০ কেজি গম বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বেলগাছার মিয়াপাড়া তারা শেখের বাড়ি থেকে নজরুল মিস্ত্রির বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণে পাঁচ টন ৫৫০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরেজমিনে সেখানে নামমাত্র কাজের চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বেলাল ও সুজন জানান, মাহিন্দ্র গাড়িতে করে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ গাড়ি মাটি ফেলা হয়েছে। তাদের দাবি, এতে বরাদ্দের অর্ধেক চালও ব্যয় হওয়ার কথা নয়।
তবে প্রকল্পের সভাপতি ও বেলগাছা ইউপি সদস্য বাবুল আকন্দ বলেন, ‘ঠিকমতোই কাজ করা হয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টিতে রাস্তা ভেঙে গেছে।’ চিনাডুলীর পূর্ব বামনা আছাদ আলীর পুকুরপাড় থেকে আব্দুস ছালামের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণে পাঁচ টন ৫৩০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে তেমন কোনো কাজই হয়নি।
প্রকল্পের সভাপতিকে এমন প্রশ্নের জবাবে চিনাডুলী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম প্রথমে বলেন, ‘হয়তো আমি সভাপতি, না হয় মহিলা মেম্বার।’ পরে জানা যায়, ওই প্রকল্পের সভাপতি তিনি নিজেই। তার দাবি, কাজ যথাযথভাবেই হয়েছে।
পাথর্শীর হাড়িয়াবাড়ি পূর্বপাড়া স্বাধীনের বাড়ি থেকে তিন রাস্তার মোড় পর্যন্ত রাস্তা এইচবিবিকরণে সাত টন ২৭০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয় আকবর ও পারভীনের দাবি, সেখানে বরাদ্দের অর্ধেক চালও ব্যয় হয়নি।
প্রকল্পের সভাপতি ও পাথর্শী ইউপি সদস্য ফুলু শেখ বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান সাহেবের পরামর্শে কাজ করা হয়েছে।’ তবে ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আলম বাবলু বলেন, ‘আমার সঙ্গে সমন্বয় করা হয় না। আমি নামমাত্র চেয়ারম্যান পদে আছি।’
কাঠমা ফয়েজভানী দাখিল মাদরাসা ভোটকেন্দ্রের রাস্তা পুনর্নির্মাণে বরাদ্দ ছিল ৯ টন ৬৬০ কেজি চাল। স্থানীয় আলমাছ ও সোহেল বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। এখন কেউ কাজ করতেও আসছে না।
অবশ্য প্রকল্পের সভাপতি ও নোয়ারপাড়া ইউপি সদস্য রকিবুল হাসান দাবি করেন, সাত মাস আগে কাজ শেষ করেছি। ইউএনও স্যারের দিকনির্দেশনায় কাজ করা হয়েছে। পূর্ব সিরাজাবাদ নদরুর বাড়ি সংলগ্ন ব্রিজের পাশে গাইড ওয়াল নির্মাণে চার টন ২১০ কেজি গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয় আকবর, সুজা ও জবেদের অভিযোগ, মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে কাজ করে বরাদ্দের বাকি খাদ্যশস্য আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তবে পলবান্ধা ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান কমল বলেন, বরাদ্দ যেমন, কাজও তেমন হয়েছে। চাল আত্মসাতের অভিযোগ ভিত্তিহীন।
ইসলামপুরের বর্তমান ইউএনও শাহ্ মো. জুবায়ের বলেন, এ উপজেলায় আমার যোগদানের আগেই প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ ছাড় দেওয়া হয়েছে। যারা তদারকিতে ছিলেন, বিষয়টি তাদেরই খতিয়ে দেখার দায়িত্ব। তৎকালীন ইউএনও নামজুল হুসাইন বলেন, প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হয়ে থাকলে বিল না দিতে পিআইওকে নির্দেশনা দিয়েছি।
ইসলামপুরে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বকশীগঞ্জের পিআইও মো. হাবীবুর রহমান সুমন বলেন, প্রকল্প পরিদর্শন করে বিল দিয়েছি। যথাযথভাবে কাজ না করে থাকলে কাজ করানো হবে।
তবে প্রকল্পের মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হওয়ার পর কীভাবে কাজ করানো হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কাজ শেষ হয়েছে মর্মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়নি। মাঠপর্যায়ে কাজ চলমান।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই মাস পরও যদি কাজ চলমান থাকে, তাহলে প্রকল্পের নামে বরাদ্দ করা বিপুল পরিমাণ চাল-গমের সঠিক ব্যবহার ও কাজের মান যাচাই করা হয়েছে কি না। স্থানীয়দের দাবি, শুধু কাগজে-কলমে নয়, প্রতিটি প্রকল্পের বরাদ্দ, উত্তোলন ও বাস্তব কাজের পরিমাণ প্রকাশ্যে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

