নবীজির বাচনিক প্রজ্ঞা

আব্দুল্লাহ আল মুবাশ্বির

নবীজির বাচনিক প্রজ্ঞা

মানুষের ব্যক্তিত্ব, চরিত্র ও মর্যাদা উন্মোচিত হয় কথাবার্তা ও বাচনভঙ্গির মাধ্যমে। কথাবার্তার বিষয় ও শব্দচয়ন, বাক্যের শৈলী, স্বরের উত্থানপতন, বলার ভঙ্গি ও বর্ণনার তেজস্বিতা বুঝিয়ে দেয় বক্তা কোন পর্যায়ের ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

বিজ্ঞাপন

রাসুল (সা.) বাচনিক প্রজ্ঞার সর্বময় গুণাবলির অধিকারী ছিলেন। প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত কথা বলতেন না এবং যেখানে কথা বলা দরকার, সেখানে নিশ্চুপও থাকতেন না। বরং তিনি ছিলেন পরিমিতভাষী। তার মেজাজে যেমনি ছিল গম্ভীরতা, তেমনি ছিল হাস্যরসিকতা। এজন্যই তাকে ‘জাওয়ামিউল কালিম’ দ্বারা ভূষিত করা হয়েছিল। কারণ তার সংক্ষিপ্ততম বাক্যগুলো ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ প্রকাশ করত।

জায়েদ বিন ছাবেত (রা.) বলেন, ‘যখন আমরা দুনিয়াবি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম, তখন রাসুল (সা.) তাতেও অংশ নিতেন। যখন আমরা আখিরাতের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম, তখন তিনিও সে বিষয়ে বক্তব্য রাখতেন। আমরা যখন খানাপিনা সম্পর্কে কোনো কথা বলতাম, তখন তিনিও তাতে যোগ দিতেন।’ কিন্তু এসব সত্ত্বেও রাসুল (সা.) কসম খেয়ে বলেছেন, আমার মুখ দিয়ে সত্য কথা ও ন্যায্য কথা ছাড়া আর কিছুই বের হয়নি। কোরআনও সাক্ষ্য দিয়েছে, ‘তিনি মনগড়া কিছু বলেন না।’

হুনাইনের যুদ্ধের পর গনিমত বণ্টনের সময় যখন নওমুসলিমদের তাদের প্রাপ্য থেকে অধিক পরিমাণে দিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন আনসারদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। এসব বুঝতে পেরে রাসুল (সা.) আনসারদের জন্য ভিন্ন একটা তাঁবু গেড়ে তাদের তার মায়ামাখা কথার জাদু দিয়ে প্রভাবিত করলেন। তিনি বললেন, ‘মক্কা বিজয়ের পর নওমুসলমানরা উট, ঘোড়া ও গনিমত নিয়ে বাড়ি ফিরছে। আর আমার আনসার সাহাবিরা আল্লাহ ও তার রাসুলকে নিয়ে ঘরে ফিরবে।’ তার একটি কথায় গোটা আনসার সাহাবিদের কাফেলায় মুহূর্তের মধ্যে কান্নার রোল বয়ে গেল। তারা সমস্বরে বলে উঠল, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা আপনার সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট আছি।’

কথা বলার সময় তিনি প্রতিটি শব্দমালা স্পষ্টভাবে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করতেন, এমনকি শ্রোতারা চাইলে তা গণনাও করতে পারত। মদিনায় হিজরতকালে, উম্মে মা’বাদের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণের পর তার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘তার কথা যেন মুক্তার মালা।’

বস্তুত তিনি ছিলেন আরবের সর্বাপেক্ষা সুভাষী মানুষ। রাসুল (সা.)-এর ভাষার সাহিত্যিক মান যেমন উচ্চ ও উৎকৃষ্ট ছিল, তেমনি তা ছিল সরল ও সহজবোধ্য। কখনো তিনি নিচুমানের ও অশালীন শব্দ ব্যবহার করেননি। উপরন্তু, সর্বময় দাওয়াত ও নিজের লক্ষ্যের প্রয়োজনে একটা নিজস্ব ভাষা তৈরি করেছিলেন। একটা স্বতন্ত্র বাচনভঙ্গি বানিয়ে নিয়েছিলেন। তার বিখ্যাত উক্তি ‘যুদ্ধ একটা কৌশল’-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এটা রাসুল (সা.)-এর বিশেষ ভাষা। তিনি এরূপ বহু ভাষা, পরিভাষা, বাগধারা, উপমা উদ্ভাবন করেছেন।

একবার বনু নাহদ গোত্রের কয়েক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতা শেষে বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি ও আমরা একই মায়ের সন্তান, একই জায়গায় লালিত-পালিত হয়েছি। তবু আপনি যে ভঙ্গিতে কথা বলেন, এর মর্মার্থ আমাদের অধিকাংশ লোকই ঠাওর করতে পারে না।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ স্বয়ং আমাকে ভাষা ও সাহিত্য শিখিয়েছেন, তাই সর্বোত্তম ভাষাই শিখিয়েছেন। তাছাড়া আমি বনু সাদ গোত্রে লালিত-পালিত হয়েছি। এটাই এর রহস্য।’

তিনি লম্বা ভাষণ দিতেন না। ঘন ঘন বক্তৃতাও দিতেন না। সমাজের প্রয়োজনে ও তার সার্বিক পরিবেশ অনুসারে ভারসাম্যপূর্ণ বক্তৃতা দিতেন। তিনি মসজিদে বক্তৃতা প্রদানকালে লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতেন। যুদ্ধের ময়দানে বাহনের উপরে বসে বক্তৃতা করতেন। গুরুত্বারোপের জন্য কখনো কখনো ‘যার হাতে আমার প্রাণ’, বা ‘যার হাতে মুহাম্মদের জীবন, তার শপথ’—এই বলে শপথ করতেন।

ইসলামের দাওয়াত উম্মাহর মধ্যে পৌঁছে দিতে, বাকপটুতা অনেক গুরুত্ব বহন করে। বাচনভঙ্গিই পারে মানুষকে কাছে টানতে, এটিই পারে দূরে ঠেলে দিতে। তাই, কথা বলার শৈলী, ভঙ্গিমা, ধরন কীরূপ হবে, তার উত্তম দৃষ্টান্ত রয়েছে রাসুল (সা.)-এর জীবনীতে। আমাদের সেখান থেকেই শিখতে হবে এবং তাকেই অনুসরণ করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন