বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক পরাশক্তিই সেমিফাইনালের মঞ্চে হোঁচট খেয়েছে। ব্রাজিল, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স—সবাই কোনো না কোনো সময় শেষ চারে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে আর্জেন্টিনা কখনো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হারেনি। আর্জেন্টিনা যেন এই মঞ্চের জন্যই তৈরি। ১৯৩০ থেকে ২০২২—বিশ্বকাপে পাঁচবার সেমিফাইনাল খেলেছে আলবিসেলেস্তেরা, আর পাঁচবারই জিতে উঠেছে ফাইনালে। ফিফাও এই রেকর্ডকে আর্জেন্টিনার অন্যতম অনন্য কীর্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে। পাঁচটি সেমিফাইনালে প্রতিবারই একজন করে নায়ক সামনে এসেছেন, যার জাদুতে আর্জেন্টিনা পৌঁছে গেছে শিরোপার মহামঞ্চে।
১৯৩০ : স্টাবিলের গোলঝড়ে প্রথম ফাইনাল
বিশ্বকাপের প্রথম আসর। মন্টেভিডিওর সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে যুক্তরাষ্ট্রকে ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত করে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। সেদিন ম্যাচের নায়ক ছিলেন স্ট্রাইকার গিয়ের্মো স্টাবিলে। তিনি করেছিলেন জোড়া গোল। আরেকটি জোড়া গোল আসে কার্লোস পেউসেলের কাছ থেকে। এছাড়া আলেসান্দ্রো স্কোপেল্লি ও লুইস মন্তিও নাম লেখান স্কোরশিটে। স্টাবিলে পুরো টুর্নামেন্টেই ছিলেন অপ্রতিরোধ্য; আট গোল করে জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট। প্রথম বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার উত্থানের সবচেয়ে বড় মুখ ছিলেন তিনিই।
১৯৮৬ : ম্যারাডোনার একক মহাকাব্য
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় সেমিফাইনাল পারফরম্যান্সগুলোর একটি উপহার দিয়েছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিতর্কিত ও অবিস্মরণীয় কোয়ার্টার ফাইনালের পর বেলজিয়ামের বিপক্ষেও তিনিই ছিলেন সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে দুই অর্ধে দুটি দুর্দান্ত গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-০ ব্যবধানে জিতিয়ে ফাইনালে তুলেছিলেন ‘ফুটবল ঈশ্বর’। পুরো টুর্নামেন্টে ম্যারাডোনা এমন প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে অনেকের মতে, ১৯৮৬ বিশ্বকাপ কার্যত একজন মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের গল্প হয়ে উঠেছিল।
১৯৯০ : গোইকোচিয়ার গ্লাভসে লেখা অলৌকিক রাত
চার বছর পর দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা ইতালির বিপক্ষে খেলছিল স্বাগতিক দর্শকদের সামনে, নেপলসের সান পাওলো স্টেডিয়ামে। সালভাতোরে স্কিলাচির গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ক্লদিও কানিজিয়ার হেডে সমতা ফেরায় আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়েও ফল না বদলানোয় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানেই জন্ম নেয় সার্জিও গোইকোচিয়ার মহাকাব্য। ইতালির দুটি শট ঠেকিয়ে তিনি একাই আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে পৌঁছে দেন। ১৯৯০ বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে তার অসাধারণ গোলকিপিং আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০১৪ : রোমেরোর দেয়ালে থেমে যায় নেদারল্যান্ডস
২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে আবার বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা। ব্রাজিলের সাও পাওলোতে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ১২০ মিনিটে কোনো দলই গোল করতে পারেনি। লিওনেল মেসি পুরো ম্যাচে নেতৃত্ব দিলেও আসল নায়ক হয়ে ওঠেন গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো। টাইব্রেকারে রন ফ্লার ও ওয়েসলি স্নাইডারের শট ঠেকিয়ে দেন রোমেরো। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার চার শুটারই সফল হন। ম্যাচ শেষে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ নির্বাচিত হন রোমেরো। তার সেই রাতের নৈপুণ্যই ২৪ বছর পর আর্জেন্টিনাকে আবার বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলে দেয়।
২০২২ : মেসির শিল্প, আলভারেজের বিস্ফোরণ
কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনাল ছিল লিওনেল মেসির পরিপূর্ণতার আরেকটি প্রদর্শনী। প্রথমে পেনাল্টি থেকে গোল, এরপর যোশকো গভার্দিওলকে কাটিয়ে অসাধারণ একক প্রচেষ্টায় জুলিয়ান আলভারেজকে দিয়ে করানো গোল—দুটিই ছিল বিশ্বমানের মুহূর্ত। আলভারেজ নিজেও করেন জোড়া গোল। ৩-০ ব্যবধানে জিতে আর্জেন্টিনা পৌঁছে যায় ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ফাইনালে, আর কয়েক দিন পর মেসি পূর্ণ করেন তার আজীবনের স্বপ্ন।
এবার কি ইতিহাসের ষষ্ঠ অধ্যায়?
১৯৩০-এ স্টাবিলে, ১৯৮৬-তে ম্যারাডোনা, ১৯৯০-এ গোইকোচিয়া, ২০১৪-তে রোমেরো, ২০২২-এ মেসি ও আলভারেজ; প্রতিটি সেমিফাইনালেই একজন বা একাধিক নায়ক লিখেছেন আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার গল্প। সেই কারণেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল আর্জেন্টিনার কাছে শুধু একটি ম্যাচ নয়, এটি যেন নায়ক জন্ম দেওয়ার মঞ্চ। এবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আরেকটি পরীক্ষা। প্রশ্ন একটাই, আর্জেন্টিনা কি তাদের শতভাগ সেমিফাইনাল রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রেখে ইতিহাসে যোগ করবে আরেকটি সোনালি অধ্যায়, নাকি শেষ পর্যন্ত ভাঙবে ৯৬ বছরের সেই অদম্য ধারাবাহিকতা? উত্তরের অপেক্ষায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

