১০৫ মিটারের বোর্ডে দুই মাস্টারের যুদ্ধ

c43f2031-a2c6-4b68-9d2e-b872b4482a0e-02-03
আরিফুল হক বিজয়

১০৫ মিটারের বোর্ডে দুই মাস্টারের যুদ্ধ

দাবার বোর্ডে গ্র্যান্ডমাস্টাররা চাল দেন খুব বেছে। খুব কম সময়েই প্রথম চালে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেন। তারা বরং অপেক্ষা করেন প্রতিপক্ষের জবাবের। একটি ঘুঁটি এগিয়ে দেন; কখনো একটি ঘোড়া উৎসর্গ করেন, কখনো একটি নৌকা সরিয়ে তৈরি করেন অদৃশ্য ফাঁদ। দর্শকের চোখ তখন থাকে ঘুঁটির দিকে, কিন্তু আসল যুদ্ধটা চলতে থাকে দুই মস্তিষ্কের ভেতর। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মাঠের লড়াইয়েও এই যুদ্ধটা বেশ চমকপ্রদ। ১০৫ মিটারের সবুজ বোর্ডে সমান ২২ জন সেনার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন দুজন মাস্টার। একটি বদলি, একটি ফরমেশন পরিবর্তন কিংবা একটি প্রেসিংয়ের নির্দেশ—মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের চিত্র। মেসি আর হ্যারি কেইনদের লড়াইয়ের আড়ালে চলবে আরো একটি নীরব মহারণ। ডাগআউটের দুই প্রান্তে মস্তিষ্কের লড়াইয়েও নামবেন লিওনেল স্কালোনি ও টমাস টুখেল। একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ঠান্ডা মাথার স্কালোনি, অন্যদিকে ইউরোপের অন্যতম সেরা কৌশলী টুখেল।

স্কালোনির সবচেয়ে বড় শক্তি তার নমনীয়তা। তিনি কোনো নির্দিষ্ট ছকের বন্দি নন। প্রতিপক্ষ অনুযায়ী বদলে ফেলেন পুরো পরিকল্পনা। কখনো আর্জেন্টিনা ৪-৩-৩, কখনো ৪-৪-২, আবার কখনো ৪-২-৩-১ ফরমেশনে খেলেছে। তার কাছে কৌশল নয়, ম্যাচের চাহিদাই শেষ কথা। প্রতিপক্ষের দুর্বল জায়গা খুঁজে বের করে সেখানে আঘাত হানাই তার দর্শন। বিশ্বকাপে এই দর্শনের প্রমাণ মিলেছে বারবার। কখনো মাঝমাঠে বাড়তি একজন রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছেন, কখনো উইং দিয়ে দ্রুত আক্রমণে প্রতিপক্ষকে ভেঙেছেন। তার নিজস্ব মন্ত্র, ‘অ্যাটাক ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স’। স্কালোনি জানেন, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সৌন্দর্যের চেয়ে কার্যকারিতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে টমাস টুখেলকে অনেকেই ফুটবলের ‘গ্র্যান্ডমাস্টার’ বলেন। কারণ তিনি শুধু নিজের দল নিয়েই ভাবেন না, প্রতিপক্ষের চিন্তার ভেতরেও ঢুকে পড়েন। একটি ম্যাচে দুই-তিনবার ফরমেশন বদলে দেওয়া, হঠাৎ প্রেসিংয়ের ধরন পাল্টে দেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট একজন খেলোয়াড়কে আলাদা দায়িত্ব দেওয়া—এসব তার কাছে নিত্যদিনের ব্যাপার। চেলসিকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতানোর পথে তিনি যেভাবে একের পর এক বড় দলকে কৌশলে হারিয়েছিলেন, সেই একই দর্শন এখন দেখা যাচ্ছে ইংল্যান্ডেও। তার দল বলের দখল রাখতে পারে, আবার প্রয়োজনে নিচু ব্লকে নেমে প্রতিআক্রমণেও সমান ভয়ংকর হতে পারে।

তাই সেমিফাইনালের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কে কাকে আগে পড়তে পারবেন? স্কালোনি কি টুখেলের প্রেসিংয়ের ফাঁক খুঁজে বের করতে পারবেন? নাকি টুখেল মেসিকে বিচ্ছিন্ন করার নতুন কোনো পরিকল্পনা সাজাবেন? আবার টুখেলের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কারণ স্কালোনির আর্জেন্টিনা শুধু মেসিনির্ভর নয়। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার কিংবা রদ্রিগো ডি পলের মতো পরিশ্রমী ফুটবলাররা মুহূর্তেই ম্যাচের ছন্দ বদলে দিতে পারেন। একইভাবে টুখেলের ইংল্যান্ডও শুধু হ্যারি কেইনের দল নয়; বেলিংহাম, সাকা, ফোডেন কিংবা রাইস—সবাই ম্যাচ ঘোরানোর ক্ষমতা রাখেন। এই কারণেই সেমিফাইনালে একটি বদলিও হয়ে উঠতে পারে টার্নিং পয়েন্ট। একজন ক্লান্ত উইঙ্গারের জায়গায় দ্রুতগতির নতুন ফুটবলার নামানো, মাঝমাঠে অতিরিক্ত একজন যোগ করা কিংবা শেষ মুহূর্তে দুই স্ট্রাইকারে চলে যাওয়া—এমন একটি সিদ্ধান্তই বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের গল্প।

দুই কোচের দর্শনেও রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। স্কালোনি প্রথমে দলকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেন। তার বিশ্বাস, ড্রেসিংরুমের ঐক্যই বড় ম্যাচ জেতার প্রথম শর্ত। খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা দেন, তাদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলতে উৎসাহিত করেন। চলতি বিশ্বকাপেই দেখা গেছে স্কালোনির দুর্দান্ত মস্তিষ্কের খেলা। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে স্কালোনি ডি পলকে প্রায় ম্যান-মার্কিংয়ের দায়িত্ব দেন। ফলে সুইসরা মাঝমাঠে ছন্দ হারায়। দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা বলের দখল বাড়িয়ে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়। ম্যাচের শেষভাগে গতি বাড়ানো তার আরেকটি চাল। প্রতিপক্ষ ক্লান্ত হলে দ্রুতগতির উইঙ্গার বা ফরোয়ার্ড নামিয়ে ম্যাচের ছন্দ বদলেছেন। এই পরিবর্তনগুলো নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনাকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।

টুখেলের দর্শন আরো বিশ্লেষণভিত্তিক। তিনি প্রতিপক্ষের প্রতিটি চলাফেরা, প্রতিটি পাসিং লেন, প্রতিটি দুর্বলতা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেন। অনেকেই বলেন, তিনি ম্যাচের আগেই প্রতিপক্ষের অর্ধেক শক্তি কাগজে-কলমে কমিয়ে ফেলেন। বিশ্বকাপেই জুড বেলিংহামকে ‘ফ্রি এইট’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শুধু মাঝমাঠে আটকে না রেখে বেলিংহামকে বক্স-টু-বক্স স্বাধীনতা দিয়েছেন। ফলে তিনি কখনো ডিফেন্সে সাহায্য করেছেন, আবার মুহূর্তেই আক্রমণে অতিরিক্ত খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন। ফলতা দেখা গেছে নকআউটে। আবার কখনো প্রেসিং কমিয়ে মিড-ব্লকে নেমে প্রতিআক্রমণের ফাঁদ পেতেছেন। প্রতিপক্ষ যখন ওপরে উঠেছে, তখন দ্রুত ট্রানজিশনে ইংল্যান্ড সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অসংখ্য সেমিফাইনাল ফুটবলারদের নৈপুণ্যে স্মরণীয় হয়ে আছে। কিন্তু কিছু ম্যাচ ইতিহাসে টিকে থাকে ডাগআউটের সিদ্ধান্তের জন্যও। ২০২৬ সালের আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালও হয়তো তেমন একটি ম্যাচ হতে চলেছে। শেষ পর্যন্ত গোল করবেন মেসি, কেইন কিংবা অন্য কেউ। শিরোনামে উঠে আসবেন মাঠের নায়করাই। কিন্তু ম্যাচের অদৃশ্য গল্পটি লেখা হবে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা দুই গ্র্যান্ডমাস্টারের নিঃশব্দ মহারণেই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন