নিস্তব্ধ ছায়া থেকে সূর্যের আলো

c43f2031-a2c6-4b68-9d2e-b872b4482a0e-02-03
আরিফুল হক বিজয়

নিস্তব্ধ ছায়া থেকে সূর্যের আলো

রাতের আকাশে সব তারা একসঙ্গে জ্বলে না। কেউ শুরু থেকেই আলো ছড়ায়, আবার কেউ অপেক্ষা করে সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তটির জন্য। যখন চারপাশে সন্দেহ জমতে থাকে, সামনে এগোনোর পথ ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসে, তখনই তারা নিজের আলোয় হয়ে ওঠে দীপ্তময় সূর্য। জুড বেলিংহামের বিশ্বকাপটাও ঠিক তেমনই। গ্রুপ পর্বে তিনি ছিলেন দলের ছন্দের অংশ, কিন্তু আলোচনার কেন্দ্র নন। অথচ নকআউট পর্ব শুরু হতেই যেন বদলে গেল সবকিছু। টুখেল যখন তার তুরুপের তাসটা খুঁজছেন, আলো হয়ে দেখা দিলেন বেলিংহাম। ছায়ার আড়াল থেকে হঠাৎ সূর্যের উদয় যেন!

হ্যারি কেইন গোল করছিলেন, ইংল্যান্ড জিতছিলও। কিন্তু বেলিংহামকে নিয়ে যে প্রত্যাশা ছিল, তার পুরোটা দেখা যাচ্ছিল না। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জয়, ঘানার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র কিংবা পানামার বিপক্ষে জয়—সব ম্যাচেই তিনি পরিশ্রম করেছেন, মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করেছেন, কিন্তু গোলে নায়ক হয়ে ওঠেননি। অনেকের চোখে তিনি যেন নিজের সেরা রূপের অপেক্ষায় ছিলেন। তারপর এল নকআউট। মেক্সিকোর বিপক্ষে রাউন্ড অব ১৬-তে ইংল্যান্ড যখন কঠিন পরীক্ষার মুখে, তখন বেলিংহাম দেখালেন কেন তাকে বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার বলা হয়। জোড়া গোল করে ইংল্যান্ডকে ৩-২ ব্যবধানে জয় এনে দেন তিনি। ম্যাচের গতিপথই বদলে দেন নিজের উপস্থিতিতে।

বিজ্ঞাপন

আসল মহাকাব্য লেখা হলো কোয়ার্টার ফাইনালে। নরওয়ের বিপক্ষে ৩৬ মিনিটে পিছিয়ে পড়েছিল ইংল্যান্ড। আর্লিং হালান্ড, মার্টিন ওডেগার্ডদের আত্মবিশ্বাসে তখন দুলছিল নরওয়ে। ঠিক সেই সময় প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে বেলিংহাম সমতা ফেরান। অতিরিক্ত সময়ে আবারও ঠিক জায়গায় ঠিক সময়ে হাজির হয়ে জয়সূচক গোল। তার জোড়া গোলেই ২-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে ইংল্যান্ড। টাইব্রেকার উঁকি দেওয়ার আগেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন সময়ের সেরা এই ‘মিডম্যান’।

তরুণ এই তারকাকে নিয়ে ফিফার মন্তব্য—বেলিংহাম শুধু গোল করেন না, তিনি দলের গতি বাড়ান, চাপের সময় প্রথমে বল চান, আবার প্রয়োজনে রক্ষণেও সমান পরিশ্রম করেন। নরওয়ের বিপক্ষে গোল করার পরও উদযাপনে সময় নষ্ট করেননি। দ্রুত বল নিয়ে সেন্টার সার্কেলে ফিরে গিয়ে সতীর্থদের তাড়া দিয়েছিলেন, কারণ তার লক্ষ্য ছিল একটাই—জয়।

এই বিশ্বকাপে তার পরিসংখ্যানও বলছে, তিনি এখন শুধু মিডফিল্ডার নন, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় অস্ত্রদের একজন। ছয় ম্যাচে করেছেন ৬ গোল এবং ১ অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ সাতটি গোলে সরাসরি অবদান রয়েছে তার। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও রয়েছেন সেরা চারে। ফিফার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো মিডফিল্ডার এক আসরে এর চেয়ে বেশি গোল করেননি। আরো একটি বিরল কীর্তি গড়েছেন বেলিংহাম। টানা দুই নকআউট ম্যাচে জোড়া গোল করা সর্বশেষ ফুটবলার ছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে। চার দশক পর সেই তালিকায় নিজের নাম লিখিয়েছেন বেলিংহাম। তার আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন পেলে, গ্যারিঞ্চা, কোকশিসদের মতো কিংবদন্তিরা।

চলতি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ১৩ গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহামের পা থেকে। সংখ্যাটি প্রমাণ করে, টমাস টুখেলের দলের আক্রমণভাগে এই দুই ফুটবলারের প্রভাব কতটা গভীর। তবে বড় পার্থক্যটি হলো—যখন ম্যাচ কঠিন হয়েছে, যখন ইংল্যান্ড পিছিয়ে পড়েছে বা জয়ের জন্য একজন নায়কের প্রয়োজন হয়েছে, তখনই বারবার সামনে এসেছেন বেলিংহাম। রয়টার্সও এই তরুণকে প্রশংসায় ভাসিয়ে লিখেছে—সেমিফাইনালের আগে লিখেছে, হ্যারি কেইন অধিনায়ক হলেও এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন জুড বেলিংহাম। মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্সই থ্রি লায়ন্সকে শেষ চারে পৌঁছে দিয়েছে।

এবার সামনে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষের ডাগআউটে লিওনেল মেসি, মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো ডি পলদের মতো তারকা। কিন্তু ইংল্যান্ড জানে, তাদেরও একজন বাজির ঘোড়া আছে। যে গ্রুপ পর্বে ধীরে ধীরে নিজের ছন্দ খুঁজে নিয়েছিল, আর নকআউটে এসে হয়ে উঠেছে দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক নায়কের জন্ম হয়েছে শেষ চারের মঞ্চে। জুড বেলিংহাম কি সেই তালিকায় নিজের নাম লেখাতে পারবেন? উত্তর মিলবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আরেকটি মহারণে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন