বিশ্বকাপ যেন ফিফার ‘বাণিজ্য বিতান’!

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপ যেন ফিফার ‘বাণিজ্য বিতান’!

২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মুহূর্তটি প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন দর্শক দেখেছিল। আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের সেই ফাইনালকে অনেকেই আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে বিবেচনা করেন। মেসির মহাকাব্যিক উত্থান থেকে শুরু করে কিলিয়ান এমবাপ্পের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স মিলিয়ে ইতিহাসের সেরা ফাইনালের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল সেই আসর। কিন্তু সেই টুর্নামেন্ট ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক আজও থামেনি। কাতার বিশ্বকাপে মানবাধিকার, অভিবাসী শ্রমিকদের পরিস্থিতি এবং সমকামীদের অধিকারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ফিফার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তারা বড় ক্রীড়া আয়োজনকে ব্যবহার করছে ‘স্পোর্টসওয়াশিং’-এর জন্য।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে যৌথভাবে আয়োজিত এই টুর্নামেন্ট ইতোমধ্যে পর্দা তুলেছে। কিন্তু আসর শুরুর আগে থেকেই ফিফার সিদ্ধান্তগুলো বিশ্বজুড়ে ভক্ত ও বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। অনেকেই বিশ্বকাপকে আখ্যায়িত করেছেন ফিফার বাণিজ্যের মূল অস্ত্র হিসেবে। যাকে ফিফার ‘বাণিজ্য বিতান’ বললেও সম্ভবত ভুল হয় না।

বিজ্ঞাপন

ফিফা এবারের বিশ্বকাপে দল সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করেছে। ম্যাচের সংখ্যা বেড়েছে, টুর্নামেন্ট দীর্ঘ হয়েছে এবং আয়োজন আরো জটিল হয়েছে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো ফাইনালে হাফটাইম শো যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পীদের পারফরম্যান্স থাকবে। সমালোচকদের মতে, এসব পরিবর্তন ফুটবলের খেলার সৌন্দর্য নয়, বরং বাণিজ্যিক দিককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের দাবি, বিশ্বকাপ এখন ধীরে ধীরে একটি বিনোদন পণ্যে পরিণত হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে টিকিটের দাম নিয়ে। প্রথমবারের মতো ফিফা সরাসরি টিকিট বিক্রির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ ও রিসেল ফি চালু করেছে। ফুটবল সমর্থক সংগঠন ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ (এফএসই) অভিযোগ করেছে, অনেক সাধারণ দর্শক এখন বিশ্বকাপ দেখার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে যেখানে সবচেয়ে সস্তা টিকিট ছিল ৫৫ ডলার, ২০২৬ বিশ্বকাপে তা অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৫৬০ ডলারে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

শুধু টিকিট নয়; ভ্রমণ, হোটেল ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে একটি ম্যাচ দেখতে যাওয়ার ব্যয় এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বিশ্লেষক ও সমর্থকদের মতে, বিশ্বকাপের আসল শক্তি সব সময়ই ছিল স্টেডিয়ামের পরিবেশ; ভিন্ন দেশ থেকে আসা দর্শকদের গান, পতাকা ও আবেগ। কিন্তু উচ্চমূল্যের কারণে সেই প্রকৃত সমর্থকরা এখন স্টেডিয়াম থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এফএসই পরিচালক রোনান ইভেনের মতে, ‘অনেক মানুষ শুধু অর্থনৈতিক কারণে বিশ্বকাপ দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি যারা টিকিট কিনছেন, তারাও চাপে পড়ছেন।’ তাদের দাবি, বিশ্বকাপ এখন এমন এক ইভেন্টে পরিণত হচ্ছে যেখানে করপোরেট অতিথি ও উচ্চবিত্ত দর্শকরাই প্রাধান্য পেয়ে থাকেন।

২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে রাজনৈতিক বিষয়ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। কিছু দেশের ভিসা ও অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়ায় নির্দিষ্ট দেশের সমর্থকরা স্টেডিয়ামে উপস্থিত হতে পারবেন না বলে শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে কিছু অংশগ্রহণকারী দেশের ভক্তদের জন্য ভ্রমণ জটিল হয়ে উঠতে পারে, যা বিশ্বকাপের ‘গ্লোবাল ইউনিটি’র ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন অনেকে।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, বর্তমান বিশ্বে বিনোদন শিল্পের বাজার বাস্তবতা অনুযায়ী টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তার দাবি, ফিফা একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বকাপ থেকে অর্জিত সব আয় ফুটবলের উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। ফিফার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপে সম্প্রচার স্বত্ব থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে, যা আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ফুটবল এখন সম্পূর্ণভাবে একটি ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিস্টেম’-এ পরিণত হয়েছে। বড় ক্লাবগুলোয় এখন ৩০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত ডেটা অ্যানালিস্ট কাজ করেন এবং খেলোয়াড়দের ম্যাচ চাপও আগের চেয়ে অনেক বেশি। এর ফলে বিশ্বকাপে খেলোয়াড়রা ক্লান্ত অবস্থায় অংশ নিচ্ছেন, যা খেলার মান ও তীব্রতার ওপর প্রভাব ফেলছে বলে অনেকে মনে করেন। একাধিক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে অনেক দর্শক বিশ্বকাপে আগ্রহী নন এবং এদের একটি বড় অংশ ম্যাচ দেখার পরিকল্পনাও করছেন না। বিশ্লেষকদের মতে, ফিফা নতুন দর্শক টানার চেষ্টা করলেও তা পুরোনো ও নিবেদিত সমর্থকদের দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

ফিফার আয় ও বাণিজ্যিক সাফল্য এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপ এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে লাভজনক ক্রীড়া ইভেন্টে পরিণত হতে যাচ্ছে। তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—ফুটবল যদি তার আবেগ, সৌন্দর্য ও সমর্থকদের হারায়, তাহলে এই বিশাল সাফল্যের প্রকৃত মূল্য কী? বিশ্বকাপ কি এখনো ‘দ্য বিউটিফুল গেম’-এর প্রতীক, নাকি এটি শুধুই একটি বিশাল বাণিজ্যিক বিতানে পরিণত হয়েছে?

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন