তীব্র গ্যাস সংকটে বিপাকে পড়েছেন দেশের শিল্প উদ্যোক্তারা। এতে প্রভাব পড়েছে শিল্পোৎপাদনেও। কোথাও পুরোপুরি বন্ধ আছে কারখানা, কোথাও আবার উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। পরিবহন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে গাড়িচালকদের।
অন্যদিকে বাসায়ও ঠিকভাবে চলছে না গ্যাসের চুলা। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট নিরসন এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন বজায় রাখতে সিএনজি স্টেশনগুলোয় গ্যাস সরবরাহের রেশনিং পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা চাইলে ভোলার গ্যাসফিল্ড থেকে গ্যাস ট্রাকে করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কারখানায় আনতে পারবেন।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে দ্বিতীয় মতবিনিময় সভায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন প্রথম সভার অগ্রগতি তুলে ধরেন। সেখানে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে অধিকতর সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নীতিগত সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সভায় অর্থমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
সভার কার্যপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সিএনজি গ্যাস স্টেশন থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে গ্যাস সরবরাহের সময় (রেশনিং) ভাগ করার বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ভোলা গ্যাসফিল্ড থেকে উত্তোলন করা গ্যাস বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ট্রাকে পরিবহন করতে চাইলে তাদের প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়ও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বাস্তবায়ন করবে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সিএনজি স্টেশনগুলোতে নির্দিষ্ট সময় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ বা সীমিত (রেশনিং) রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে সাশ্রয়কৃত গ্যাস শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই রেশনিং ব্যবস্থা সাময়িকভাবে কিছু অসুবিধা তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতি এবং বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠাকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করবে।
তবে সরকারের এমন বিকল্প উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান না হলে দেশের রপ্তানি খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। গ্যাস সংকট সমাধানে সিএনজি স্টেশন থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে গ্যাস সরবরাহ রেশনিং করা হলে শিল্পকারখানা উপকৃত হবে। আর ভোলার গ্যাস বেসরকারি উদ্যোক্তারা ট্রাকের মাধ্যমে এনে কারখানায় ব্যবহার করে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সহায়ক হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ সরবরাহের সমস্যা নয়, বরং এটি ভূরাজনৈতিক ইস্যু, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। তাই বহুমুখী উৎস ও কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে এলএনজি আমদানির বিষয়টি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়া এলএনজির রিজার্ভ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বেগবান করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, সিএনজি স্টেশন থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাস সরবরাহ রেশনিং এবং ভোলার গ্যাস ট্রাকে পরিবহনের অনুমোদন বর্তমান সংকট প্রশমনে কিছুটা সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে ভোলার গ্যাস পরিবহনকে স্বল্পমেয়াদি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে এই গ্যাসকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে ব্যবহার করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) আমার দেশকে বলেন, রেশনিং পদ্ধতি চালু হলে শিল্পকারখানা উপকৃত হবে। তবে ভোলার গ্যাস আনার ক্ষেত্রে আগের সরকারও চেষ্টা করেছিল। সেটি কতখানি কাজে লাগবে তা দেখার বিষয়। তবে গ্যাস সংকট সমাধানে বিজিএমইএ একটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি কার্যকর হলে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হবে।
তিনি বলেন, গ্যাসভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট বন্ধ করে তেলভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট চালু করে সেই গ্যাস শিল্পকারখানায় দিলে উপকৃত হবে।
তৈরি পোশাকশিল্পে গ্যাস সংকট নিরসন ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিজিএমইএ। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—গ্যাসের নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে পোশাক ও বস্ত্রশিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে; নতুন সংযোগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা, যাতে কারখানাগুলো সময়মতো উৎপাদন শুরু করতে পারে; লোড বাড়ানোর প্রয়োজন নেই, শুধু সরঞ্জাম পরিবর্তন, পরিমার্জন বা স্থানান্তরের জন্য আবেদনকারীদের একটি আলাদা তালিকা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া; কম লোড বাড়ানোর আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ প্রদান, যা ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলোকে দ্রুত উৎপাদনে যেতে সাহায্য করবে এবং গ্যাস পাইপলাইনের শেষ প্রান্তে অবস্থিত কারখানাগুলোয় গ্যাসের চাপ কমে যায়, সেখানে অন্তত তিন-চার পিএসআই চাপ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোলায় অবস্থিত গ্যাসফিল্ডগুলোতে বিপুল অব্যবহৃত বা অতিরিক্ত গ্যাস রয়েছে। কিন্তু পাইপলাইন সংযোগ না থাকায় মূল ভূখণ্ডের শিল্পাঞ্চলগুলোতে সেই গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে নতুন নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে কোনো উদ্যোক্তা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান চাইলে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিশেষায়িত ট্রাকে করে ভোলার গ্যাস সিলিন্ডার বা কনটেইনারের মাধ্যমে কারখানা পর্যন্ত পরিবহন করতে পারবেন। এজন্য জ্বালানি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সহযোগিতা দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং পাইপলাইনের ওপর নির্ভরতা কমাবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

