হরমুজে অচলাবস্থা ভাঙতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র, নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায় ইরান

হরমুজে অচলাবস্থা ভাঙতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র, নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায় ইরান

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবারো শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি হামলা। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক হামলাগুলো আগের তুলনায় সীমিত হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দুই পক্ষই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফিরে যেতে চাইছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রেখে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে অচলাবস্থা ভাঙার পথ খুঁজছে ইরান।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার ইরানে আবারো হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে ইরান জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে হামলা চালায়। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান পাল্টা হামলা চালালে তাদের আরও ‘কঠোরভাবে’ আঘাত করা হবে।

তবে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করেই মূলত হামলা চালানো হয়েছে। বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোকে তুলনামূলকভাবে এড়িয়ে চলেছে উভয় পক্ষ। ইরানের পক্ষ থেকেও সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে নতুন করে হামলা চালানো হয়নি।

ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিত্রিনোভিচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, দুই পক্ষই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়ে চললেও ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার’ ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালিই হয়ে উঠেছে মূল যুদ্ধের কেন্দ্র

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অচলাবস্থার অন্যতম কেন্দ্র হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ, এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়। ইরানের পক্ষ থেকে এই পথে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ—দুটিই এখন পরিস্থিতিকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) ইরানবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, কোনো পক্ষই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফিরতে চায় না। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বাধা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ—দুটিই উভয় পক্ষের জন্য ক্রমেই ‘অসহনীয়’ হয়ে উঠছে।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজকে সামরিক পাহারা দিয়ে পার করে। এসব জাহাজে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল ছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর একদিনে এটিই ছিল সর্বোচ্চ সংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে পার করে দেওয়ার ঘটনা।

তবে এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট পুরোপুরি কাটেনি। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামান্য কমলেও তা এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের জাতীয় গড় মূল্য ৪ দশমিক ১৪ ডলার। এক বছর আগে এই দাম ছিল ৩ দশমিক ১৯ ডলার।

hormuz

যুদ্ধের খরচ চাপে ফেলছে যুক্তরাষ্ট্রকেও

ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও বাড়ছে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ। জুলাই পর্যন্ত সংঘাতে ওয়াশিংটনের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত থেকেও বিপুল পরিমাণ তেল ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের মজুত ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।

সামরিক ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে। যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স বা থাডের প্রায় ৮০ শতাংশ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহৃত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় অর্ধেক ইন্টারসেপ্টরও ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে। তবে কিছু ধরনের অস্ত্রের মজুত ‘তুলনামূলকভাবে সীমিত’ বলেও স্বীকার করেছেন তিনি।

trump

এদিকে যুদ্ধের মেয়াদ বা জ্বালানির দাম কবে আবার যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরবে—এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বরং সংঘাত শেষ করার দায়িত্ব ইরানের ওপরই দিয়েছেন তিনি।

যুদ্ধ নিয়ে বাড়ছে মার্কিন জনঅসন্তোষ

ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও অসন্তোষ বাড়ছে। ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয় অ্যামহার্স্টের (ইউমাস অ্যামহার্স্ট) প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মার্কিনি ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতিতে অসন্তুষ্ট। সোমবার প্রকাশিত ওই জরিপে ট্রাম্পের সামগ্রিক অনুমোদনের হার ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে।

এদিকে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে সতর্ক করেছেন যে ইরানে দীর্ঘমেয়াদি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া টেকসই নয়। এতে বিশ্বের অন্য অঞ্চলের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করেনি সিএনএন।

অর্থনৈতিক সংকটে আরো বিপর্যস্ত ইরান

অন্যদিকে যুদ্ধের প্রভাব ইরানের অর্থনীতিতে আরো গভীর। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মধ্যে ইরানের তেল বিক্রি কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অস্ত্রের মজুতও দ্রুত কমছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ‘আশঙ্কাজনক পর্যায়ে’ পৌঁছেছে। অনেক শ্রমজীবী পরিবার নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কেনার সামর্থ্য হারাচ্ছে।

ইরানি লেবার নিউজ এজেন্সির (আইএলএনএ) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই পর্যন্ত ১২ মাসে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইরান বিশেষজ্ঞ আরাশ আজিজির মতে, ইরানের অর্থনীতি ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির শাসকগোষ্ঠী মনে করছে, সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলে তাদের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ইরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। কারণ তেহরান হিসাব করছে, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ অনির্দিষ্টকাল সহ্য করা সম্ভব নয় এবং অচলাবস্থা ভাঙতেই হবে।

আলোচনার দরজা খোলা রাখতে চায় তেহরান

যদিও সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে, ইরান এখনো আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) অধীনে নিজেদের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে এলে তেহরানও তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা পদক্ষেপ নেবে এবং আলোচনায় ফিরতে প্রস্তুত থাকবে।

তবে ট্রাম্পের অবস্থান ভিন্ন। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার জন্য তিনি কোনো চাপ প্রয়োগ করতে চান না। বরং হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান এবং ইরানের অর্থনীতির দুর্বল হয়ে পড়াকে তিনি নিজেদের জন্য বেশি সুবিধাজনক বলে মনে করছেন।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, তিনি আলোচনার টেবিলে ইরানকে বাধ্য করার চেষ্টা করছেন না এবং বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে তিনি বেশি পছন্দ করছেন।

অচলাবস্থা কত দিন টিকবে?

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক ভারসাম্য তৈরি করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু একই সঙ্গে কেউই নিজেদের অবস্থান থেকে পিছু হটতে চাইছে না।

সিত্রিনোভিচের মতে, ওয়াশিংটন যেখানে সংঘাতকে সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত রেখে মূলত অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখতে চাইছে, তেহরান সেখানে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা নতুন বাস্তবতা চ্যালেঞ্জ করতে চাইছে।

আইসিজির হামিদরেজা আজিজির মতে, ইরানের সাম্প্রতিক আচরণ এবং মার্কিন হামলার পর দ্রুত ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখানোর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে তেহরান আত্মসমর্পণের পরিবর্তে পাল্টা জবাব দেওয়ার পথই বেছে নিয়েছে।

ফলে দুই পক্ষই উত্তেজনার সিঁড়িতে ধাপে ধাপে ওপরে উঠছে, যদিও তারা জানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন