সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের অন্তর্ভুক্তি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মনোনয়ন ইস্যুতে জাতীয় সংসদে বাহাস হয়েছে। রোববার সংসদের বৈঠকে মাগরিবের নামাজের বিরতির পর সংসদীয় কমিটি গঠনের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম এবং বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের মধ্যে এ বাহাস হয়।
এ সময় সরকারি দল থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল নাম না দিলে তাদের সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হবে না। অপরদিকে বিরোধী দল আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, তারা সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে নাম দেবে না। একই সাথে তারা জুলাই সনদ অনুযায়ী নির্বাচনে প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। এর আগে চিফ হুইপ দাবি করেন, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে নাম দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে বিরোধী দল তা অস্বীকার করেছে।
সরকারি দল ও বিরোধী দলের পরস্পর বিরোধী অবস্থানের মুখে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি সমস্যার সমাধানে দুই দলের শীর্ষ নেতাদের ‘ক্লোজ ডোর’আলোচনার অনুরোধ করেন।
দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী গতকাল মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গঠনের কথা থাকলেও এই বিতর্কের পর নতুন কমিটি গঠন করা হয়নি। কয়েকটি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।
গত ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলকে ওই কমিটিতে পাঁচজনের নাম দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে বিরোধী দল কারও নাম দেয়নি। তারা এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে গঠন পর্ব থেকে ওয়াকআউট করে।
বিরোধী দলীয় উপনেতার সঙ্গে টেলিফোন কথোপকথনের কথা উল্লেখ করে গতকাল অনির্ধারিত আলোচনায় স্পিকারকে সম্বোধন করে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম সংসদে বলেন, সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত কমিটিতে নাম দেওয়ার জন্য আগে তাদের (বিরোধী দল) আহ্বান করেছিলাম, তারা কিছুটা নমনীয় ছিলেন। বিরোধী দলীয় উপনেতার সাথে আমার কথা হয়েছে। তারা আজকে বলেছে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে থাকবেন। সে কারণে সংবিধান সংশোধন কমিটি পুনর্গঠন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন সংক্রান্ত কমিটিগুলো আজকে উত্থাপন করতে চাই না। তার আগে বিরোধী দলীয় উপনেতাকে যদি সময় দেন।
এরপর বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, সংসদ সদস্যদের সংখ্যা অনুসারে সংসদীয় কমিটিতে সদস্য এবং অন্যান্য বিষয় বণ্টন হওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। ২৬ শতাংশ সদস্য পেতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কমিটিগুলির সভাপতিরও ২৬ শতাংশ বিরোধী দল থেকে হবে। কিন্তু যে কয়টি কমিটি চূড়ান্ত হয়েছে সেখানে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোনো সভাপতি এখন পর্যন্ত হয়নি। শুধু সংসদ সম্পর্কিত একটি সভাপতি করা হয়েছে। আমাকেই ওই কমিটির সভাপতি করা হয়। মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কোনো কমিটির সভাপতি করা হয়নি।
চিফ হুইপের সঙ্গে আলাপ হয়েছে উল্লেখ করে তাহের বলেন, তিনি সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যাওয়ার কথা বলেননি। একটার সঙ্গে আরেকটা রিলেটেড হতে পারে না। আমরা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন করেই কিন্তু এখানে আসছি। সুতরাং আমরা এটা চাই না যে এই সংসদেও একজনের বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। কিছু সংসদ সদস্য বেশি অধিকার পাবেন, আবার কিছু সংসদ সদস্য বঞ্চিত হবেন। এটা যেন এখানে নতুন করে উদাহরণ না হয়।
তিনি বলেন, ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংসদ চলবে। এর ভেতর একটা সমঝোতা হলে সুন্দর হবে। বৈষম্য বিরোধী একটা পার্লামেন্টের একটা নজির স্থাপিত হবে।
জবাবে চিফ হুইপ বলেন, স্বাধীনতার ৫৪/৫৫ বছরে বিগত দিনে কখনো বিরোধী দল থেকে কোনো কমিটির সভাপতি করা হয়নি। জিয়াউর রহমান পাবলিক কমিটির সভাপতি করেছিলেন। ইতোমধ্যে এটা বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে।
চিফ হুইপ বলেন, তারা ঐক্যবদ্ধভাবে সব সমস্যার সমাধান করতে চান। সংবিধান সংশোধনও ঐক্যবদ্ধভাবে করার ইচ্ছা ছিল।
বিরোধী দলীয় উপনেতার সঙ্গে কথা হয়েছে উল্লেখ করে নুরুল ইসলাম বলেন, বিগত দিনে (বিরোধী দলকে দেওয়ার) কোন রেওয়াজ নাই, আমরা সেটা দেব না এবং আমরা আপনাকে (তাহেরকে) একটা কমিটি (সভাপতি) করেছি। আমরা আর করতে পারব না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জুলাই সনদ যেভাবে সই হয়েছে দাঁড়ি কমাসহ সেভাবে বাস্তবায়িত হবে।
চিফ হুইপ বলেন, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করলে তারা যেভাবে চেয়েছে সেভাবে সভাপতি দিতে আমরা রাজি আছি।
পরে সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘আমাদের প্রিন্সিপাল ডিসিশন হচ্ছে সরকারের সংবিধান সংশোধন যে কমিটি এই কমিটিতে আমরা পার্টিসিপেট করবো না।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি যে একটা কমিটিতে জয়েন করানোর জন্য আমাদের উপর শর্তারোপ করে জোর জবরদস্তি করার যে একটা ট্র্যাডিশন বা যে কথা বলছেন এটা আমরা সঠিক মনে করি না। যে কমিটিগুলো হয়েছে সেখানে আমাদের আনুপাতিক হারে সদস্য করা হয়েছে। আমরা মনে করি সভাপতি পদেও আমাদের ২৬ শতাংশ পদ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ফ্লোর নিয়ে বলেন, সংসদ নেতা নিজেই উদ্যোগী হয়ে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদে একজনের নাম দিতে বলা হয়েছিল। এজন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়নি। কিন্তু বিরোধী দল বলেছিল এ পর্যায়ে তারা ডেপুটি স্পিকারের পদ নেবে না। তখন আমরা ভাবলাম জুলাই জাতীয় সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে অর্থাৎ সংবিধান সংশোধিত হলে সেই অনুযায়ী আমরা যাব।
সংবিধান সংশোধন কমিটি করার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত এই কমিটিতে আসবে না। আজকেও পুনরাবৃত্তি করেছে। সব অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষে সমৃদ্ধ সংবিধান সংশোধনী বিল আনা হবে। সেটা পাশ হলে তারপরে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হবে।
ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত অন্যান্য কমিটিগুলো সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দল সভাপতি পাবেন। সেজন্য তো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হতে হবে। সংবিধান সংশোধন করা হবে।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমাদের উদারতা এই জায়গায় শুধু আমাদের চিফ হুইপ প্রস্তাব দিয়েছেন আসুন, সংবিধান সংশোধনী সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে আপনারা অংশগ্রহণ করুন। শুরু করুন। আমরাও জুলাই জাতীয় সনদ যুগপদভাবে বাস্তবায়ন শুরু করি। আপনাদের সেই অনুসারে সভাপতিত্ব এ কমিটিগুলো পাওয়া যাবে। খুবই ভ্যালিড যুক্তি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনারা যদি সহযোগিতার হাত না বাড়ান এবং সব বিষয়ে বলেন যে আগে সব দিতে হবে, তারপরও আমরা সেই কমিটিতে আসবো না, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে, সেটা তো সহযোগিতা হলো না। একতরফা হলো যে আপনাদের সকল দাবি মানতে হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপনারা সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসুন। আপনাদের যা বক্তব্য আছে আমরা সেটা লিপিবদ্ধ করবো। আপনাদের সমস্ত রিপোর্ট বক্তব্য সেই রিপোর্টে থাকবে। আপনাদের বক্তব্য জাতি জানবে। আপনারা দ্বিমত হবেন, ভিন্নমত হবেন এবং কিছু কিছু প্রস্তাবতো অবশ্যই একমত হবেন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনারা সবই জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে চাইবেন। অথচ সনদ বাস্তবায়নের জন্য সহযোগিতায় আসবেন না, এটা বিপরীতমুখী হয়ে যায়।
দুই দলের বাহাসের পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকতেই পারে। তবে দেশের স্বার্থে সেই মতপার্থক্য কমানোর সুযোগ এখনও রয়েছে।
প্রয়োজনে প্রকাশ্য আলোচনার বাইরে দুই পক্ষের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বসার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “ওপেন এভাবে ডিসকাস করতে না পারলেও ক্লোজ ডোরে বসেন।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন’ ও ‘সংবিধান সংস্কার’ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কিছুটা শাব্দিক মতপার্থক্যও থাকতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে সেটি কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল, দেশ গড়ার ক্ষেত্রেও সেই ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানান ডেপুটি স্পিকার।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

