শেষ বাঁশি বাজার পর লিওনেল মেসি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চারপাশে তখন স্পেনের উল্লাস, আকাশে আতশবাজি, হাতে বিশ্বকাপ। আর অন্য প্রান্তে ৩৯ বছর বয়সি এক কিংবদন্তি নীরবে তাকিয়ে ছিলেন শূন্যে। ক্যামেরার লেন্সে বন্দি হয়েছে তার চোখের জল, কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলেননি আর্জেন্টাইন মহাতারকা। সেই নীরবতাই যেন এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এটাই কি ছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ?
মেসি নিজে এখনো অবসরের ঘোষণা দেননি। বরং বিশ্বকাপের পর এ বিষয়ে একাধিকবার প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। তবে আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে বদলের ইঙ্গিতে বিষয়টা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। কোচ লিওনেল স্কালোনি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন, নিকোলাস ওতামেন্ডি ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলেছেন। আর এবার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস জানিয়ে দিয়েছেন, দলের অনেকের মতো মেসিও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন।
সংবাদমাধ্যমে পারেদেস বলেছেন, ‘অনেকের জন্যই এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে, তারা জাতীয় দলে থাকবে কি না। কী হবে, সেটা শান্ত মাথায় ভাবতে হবে।’ মেসির নাম আলাদা করে উচ্চারণ না করলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই মন্তব্যকে আর্জেন্টিনা অধিনায়কের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছে।
হয়তো সেটাই স্বাভাবিক। কেননা ২০০৫ সালে আকাশি-সাদা জার্সিতে যাত্রা শুরু করা সেই কিশোর আজ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ক্যারিয়ারের মালিক। বয়সের চোখরাঙানি উপেক্ষা করছেন প্রতিনিয়ত। কিন্তু আর কত? ক্যারিয়ারে তো অর্জনের কমতি নেই। বিশ্বকাপে তার গল্পই আলাদা। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার তিনি। ২০০৬ থেকে ২০২৬—টানা দুই দশক বিশ্বকাপের মঞ্চে ছিলেন। খেলেছেন রেকর্ড ৩৮টি বিশ্বকাপ ম্যাচ, যা পুরুষ ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালের আসরে গোল করেছেন ৮টি, করিয়েছেন ৪টি, বিশ্বকাপের ইতিহাসে ২১ গোল ও ১২ অ্যাসিস্ট।
শুধু বিশ্বকাপ নয়, আর্জেন্টিনার জার্সিতেও তার পরিসংখ্যান কিংবদন্তির মতো। জাতীয় দলের হয়ে সর্বাধিক ম্যাচ, সর্বাধিক গোল, সর্বাধিক অ্যাসিস্ট—সবই তার দখলে। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল, সঙ্গে ৬৫টি অ্যাসিস্ট। তার নেতৃত্বেই ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে ফিনালিসিমা, একই বছর কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালে আরেকটি কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছরের অপেক্ষা শেষে বিশ্বকাপ এনে দেওয়ার পর ২০২৬-এ আবারও দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি।
ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকাও বিস্ময়কর। আটটি ব্যালন ডি’অর, সর্বাধিক গোল্ডেন বল জয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে একাধিক সংস্করণে নকআউট পর্বে গোল করার বিরল কীর্তি, আন্তর্জাতিক ফুটবলে শতাধিক গোল, ক্লাব ও দেশের হয়ে ৯০০-এর বেশি গোল; পরিসংখ্যানের প্রতিটি পাতায় মেসির ছাপ।
কিন্তু সংখ্যার বাইরেও রয়েছে এক অন্য গল্প। আর্জেন্টিনা যখন টানা তিনটি বড় ফাইনাল হেরে ভেঙে পড়েছিল, তখন একবার জাতীয় দলকে বিদায়ই বলে দিয়েছিলেন তিনি। পরে ফিরে এসে বদলে দেন দেশের ফুটবল ইতিহাস। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ, এরপর আরও সাফল্য—সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিলেন মেসি। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর তার নীরবতা আরো বেশি অর্থবহ হয়ে উঠেছে।
ফাইনালের আগে ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের উদ্দেশে তার সেই সংক্ষিপ্ত বার্তা, ‘সবকিছু ভুলে যাও, শুধু খেলো’ বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। পরে পুরো ভিডিও প্রকাশিত হলে বোঝা যায়, সেটি ছিল ম্যাচের আগে অধিনায়কের স্বাভাবিক অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য। কিন্তু পরাজয়ের পর সেই কথাগুলো যেন অন্য এক আবেগ নিয়ে ফিরে এসেছে।
বিশ্বকাপের পর তাকে ঘিরে নানা গুঞ্জনও ছড়িয়েছে। কেউ বলছেন, তিনি হয়তো আর একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলবেন। কেউ মনে করছেন, এটাই ছিল শেষ অধ্যায়। তবে এসবের কোনোটিই এখনো মেসির মুখে শোনা যায়নি। হয়তো তিনি এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। হয়তো নিয়েছেন, শুধু সময়ের অপেক্ষা। আবার এটাও হতে পারে, আর্জেন্টিনার মানুষকে আরেকবার চমকে দিয়ে তিনি ফিরবেন আরো একটি অভিযানে।
আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম টিএনটি স্পোর্টস জানিয়েছে, চলতি বছরের মধ্যেই স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে ফিনালিসিমা আয়োজন করতে চায় ফিফা। তবে সেই ম্যাচে মেসিকে দেখা যাবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদি তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন, তাহলে বহুল প্রতীক্ষিত এই লড়াইয়ের আবেদনও অনেকটাই কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন ফুটবল বোদ্ধারা।
নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না কিছুই। তবে এটুকু নিশ্চিত—যেদিন লিওনেল মেসি সত্যিই বিদায় বলবেন, সেদিন শুধু আর্জেন্টিনা নয়, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটিই বিদায় নেবে। আর সেই ঘোষণার ঘণ্টা বেজে ওঠার দিকেই তাকিয়ে আছে ফুটবল বিশ্ব।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

