সিংহাসন হারাতে বসেছেন ইনফান্তিনো

সিংহাসন হারাতে বসেছেন ইনফান্তিনো
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ফাইল ছবি

ফিফা এবং এর সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ওপর বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তীব্র চাপ ও অসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছে। ফিফার প্রতিযোগিতাগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রির বিতর্কিত প্রস্তাব থেকে পিছু হটলেও রক্ষা পাচ্ছেন না ইনফান্তিনো। ইউরোপীয় ফুটবলের সংস্থা 'উয়েফা' এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকা ফুটবল সংস্থা 'কনকাকাফ' প্রকাশ্যে ফিফা প্রধানের কঠোর সমালোচনা করে সার্বিক নেতৃত্বের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে।

শনিবার উয়েফা ও কনকাকাফ পৃথক বিবৃতি জারি করে এই ব্যবসায়িক প্রস্তাব বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। তবে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারই শেষ কথা নয়; বরং এটি ইনফান্তিনোর অস্বচ্ছ নেতৃত্বের এক বড় উদাহরণ।

বিজ্ঞাপন

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ উয়েফার

ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এই সিদ্ধান্তকে ‘পুরো ফুটবল বিশ্বের জয়’ হিসেবে বর্ণনা করলেও ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের চরম অভিযোগ তুলেছে।

২০১৬ সালে প্রথমবার ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার সময় ইনফান্তিনোর দেওয়া একটি বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে উয়েফা জানায়, ‘বর্তমান ফিফা নেতৃত্ব কেবল উয়েফার নয়, ফুটবল পরিবারের অন্যান্য অনেক সদস্যেরও আস্থা হারিয়েছে।

২০১৬ সালে ইনফান্তিনো বলেছিলেন, 'ফিফার অর্থ আপনাদের অর্থ, সভাপতি হিসেবে এটি আমার অর্থ নয়। তবে তিনি এই দুই প্রতিশ্রুতির কোনোটিই রক্ষা করতে পারেননি। পেছনের দরজায় বসে তিনি যে অস্বচ্ছ চুক্তি চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, তা মোটেই গ্রহণযোগ্য ছিল না।’

উয়েফা আরো অভিযোগ করে যে, অলস পড়ে থাকা ফিফার নিজস্ব তহবিলের অর্থ ফুটবলের মূল স্তরে ব্যয় না করে অনৈতিক উপায়ে প্রতিযোগিতাগুলোর শেয়ার বিক্রি করার চেষ্টা করা হয়েছে।

উয়েফা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ফিফায় নতুন করে আস্থা ফেরানোর কাজ মাত্র শুরু হলো।

কনকাকাফ ও এএফসি-র অবস্থান

উয়েফার পরপরই কনকাকাফ একটি বিবৃতি দিয়ে জানায়, ‘ঐক্য জয়ী হয়েছে’।

তারা সরাসরি ইনফান্তিনোর নাম না নিলেও বলে, ‘সংস্থার এই ধরনের একতরফা ও চরম অনিয়ম কেবল ভুল পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা। ফুটবলকে পেছনে রেখে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে এবং বর্তমান নেতৃত্বের একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা এখনই হওয়া প্রয়োজন।’

এছাড়া এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) উয়েফা ও কনকাকাফের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম প্রথম কোনো রাষ্ট্রীয় শীর্ষ নেতা হিসেবে প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেছেন এবং ফিফার পিছু হটার সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

যেভাবে ভেস্তে গেল বিতর্কিত পরিকল্পনা

ফিফা ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)’ নামে একটি বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন করে বিশ্বকাপসহ শীর্ষ ইভেন্টগুলোর সংখ্যালঘু শেয়ার বহিরাগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করেছিল। জেপি মরগানের তৈরি ২৫ পৃষ্ঠার একটি নথিতে উল্লেখ ছিল, এর মাধ্যমে সদস্য সংস্থাগুলোর রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। তবে এতে নারীদের ফুটবলের কোনো উল্লেখ ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান 'থ্রাইভ ইটারনাল' (যার প্রতিষ্ঠাতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনার) এই গ্রুপটির নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল।

গত মঙ্গলবার এই গোপন পরিকল্পনা মিডিয়ায় ফাঁস হতেই তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। উয়েফা হুমকি দেয়, পরিকল্পনা কার্যকর হলে তারা বিশ্বকাপ বয়কট করবে। বিতর্ক বাড়তে থাকলে শুক্রবার ফিফার চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুর জানান, ফিফা প্রশাসনকেই এই প্রকল্প সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। সার্বিক পরিস্থিতির দায় নিয়ে ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্ডেইরো পদত্যাগ করেন।

চতুর্থ মেয়াদে পুনর্নির্বাচনের মুখে বড় ধাক্কা

আগামী মার্চ মাসে ফিফা কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে চতুর্থ মেয়াদের জন্য সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর। তবে ভোটের মাত্র কয়েক মাস আগে উয়েফা, কনকাকাফ এবং এএফসি-র মতো প্রভাবশালী জোটগুলোর এমন অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন বিরুদ্ধাচরণ ইনফান্তিনোকে মারাত্মক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে ফেলে দিয়েছে। ফিফা এখন পর্যন্ত উয়েফা ও কনকাকাফের এই কঠোর বিবৃতির কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন