নরওয়েকে কখনো হারাতে পারেনি ব্রাজিল, কেন?

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

নরওয়েকে কখনো হারাতে পারেনি ব্রাজিল, কেন?

ফুটবল ম্যাচ মানেই নানা রহস্য আর অবিশ্বাস্য সব রেকর্ডের খেলা, যা অনেক সময় বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিদের যুক্তিকেও হার মানায়। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এবং ইতিহাসের অন্যতম সফল দল ব্রাজিলের জন্য এমনই এক অপ্রত্যাশিত দুঃস্বপ্নের নাম নরওয়ে। আর্জেন্টিনা, ইতালি কিংবা জার্মানির মতো কোনো পরাশক্তি নয়; বরং নরওয়েই একমাত্র দল যাদের বিপক্ষে আজ পর্যন্ত কোনো জয়ের মুখ দেখেনি সেলেসাওরা।

পুরুষ ফুটবলে এ পর্যন্ত দুই দেশের চারবারের দেখায় ব্রাজিল দুটি ম্যাচ ড্র করেছে আর বাকি দুটিতে হেরেছে। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে দল দুটি মুখোমুখি হলেও শেষ হাসি সবসময় হেসেছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এই দেশটিই। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব সিক্সটিনের লড়াইয়ে যখন দল দুই আবারও মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এই রেকর্ড আলোচিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এই গল্পের শুরু ১৯৮৮ সালে ওসলোতে অনুষ্ঠিত একটি প্রীতি ম্যাচ দিয়ে। কার্লোস আলবার্তো সিলভার অধীনে ব্রাজিল তখন লড়ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চাওয়া নরওয়ের বিপক্ষে। ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়, যেখানে ব্রাজিলের হয়ে গোল করেছিলেন রোমারিও। সে সময় এটিকে কেবল হোঁচট হিসেবেই দেখা হয়েছিল। কিন্তু পেছনে তাকালে বোঝা যায়, সেটি আসলে এক অবিশ্বাস্য রেকর্ডের সূচনা মাত্র।

এর প্রায় এক দশক পর, ১৯৯৭ সালে জাগালোর কোচিংয়ে ব্রাজিল দল আরেকটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে ওসলোতে যায়। রোনালদো এবং রোমারিওর মতো তারকাদের নিয়ে গড়া ব্রাজিল খুব সহজেই জিতবে, এমনটাই আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে নরওয়ে ৪-২ ব্যবধানে ব্রাজিলকে হারিয়ে দেয়।

নরওয়ের হয়ে তোরে আন্দ্রে ফ্লো দুটি এবং জান ইভার জ্যাকবসেন ও এগিল ওস্টেনস্টাড একটি করে গোল করেন। ব্রাজিলের পক্ষে ডেনিলসন এবং রোমারিও গোল করলেও এই হার সেলেসাওদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা ছিল।

এই দ্বৈরথের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন, ফ্রান্স বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে মার্সেইর স্টেড ভেলোড্রোমে।

গ্রুপ 'এ' থেকে ব্রাজিল এরইমধ্যে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে ফেলেছে। তার পরও কোচ জাগালো রোনালদো, রিভালদো এবং বেবেতোকে নিয়ে গড়া পূর্ণ শক্তির দলই মাঠে নামান। অন্যদিকে, টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে নরওয়ের সামনে জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না।

ম্যাচের ৭৭ মিনিটে অবশেষে ডেডলক ভাঙে ব্রাজিল। ডেনিলসনের চমৎকার এক ক্রস থেকে হেডের সাহায্যে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন বেবেতো।

তবে ব্রাজিলের এই আনন্দ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ছয় মিনিট। অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে 'ফ্লোনালদো' ডাকনাম পাওয়া তোরে আন্দ্রে ফ্লো ব্রাজিলের ডিফেন্ডার জুনিয়র বাইয়ানোকে বোকা বানিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে ক্লদিও তাফরেলকে পরাস্ত করেন।

এরপর আসে সেই চূড়ান্ত মুহূর্ত। ম্যাচের ৮৯ মিনিটে জুনিয়র বাইয়ানো ডি-বক্সের ভেতর ফ্লোর জার্সি টেনে ধরলে রেফারি নরওয়ের পক্ষে একটি বিতর্কিত পেনাল্টির বাঁশি বাজান। পেনাল্টি থেকে গোল করতে ভুল করেননি কেজেটিল রেকডাল। ২-১ গোলের এই বিখ্যাত জয়ে নরওয়ে পৌঁছে যায় নকআউট পর্বে, যা ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে জায়গা করে নেয়।

পরবর্তীতে 'সোফাস্কোর'-এর মতো ক্রীড়া তথ্য প্ল্যাটফর্মগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে নরওয়ের দুর্দান্ত দলীয় পারফরম্যান্সের প্রমাণ মেলে। ম্যাচে এক গোল করা এবং পেনাল্টি আদায় করে নেওয়া তোরে আন্দ্রে ফ্লো ৮.৪ রেটিং নিয়ে ম্যাচসেরা হন। অন্যদিকে ডিফেন্ডার রনি জনসনের নেতৃত্বাধীন সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগ পুরো ম্যাচে রোনালদোকে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিল। ব্রাজিলের পক্ষে বেবেতো ও ডেনিলসন আক্রমণে উজ্জ্বল থাকলেও শেষ মুহূর্তের রক্ষণাত্মক দুর্বলতাই দলের পরাজয় ডেকে আনে।

দল দুটির শেষ দেখা হয়েছিল ২০০৬ সালে, জার্মানি বিশ্বকাপের ঠিক পরপরই। অন্তর্বর্তীকালীন কোচ দুঙ্গার অধীনে এক ঝাঁক নতুন মুখ নিয়ে ওসলো সফরে গিয়েছিল ব্রাজিল।

সেই প্রীতি ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়। ব্রাজিলের হয়ে ড্যানিয়েল কারভাহো এবং স্বাগতিকদের হয়ে মর্টেন গামস্ট পেডারসেন গোল করেন।

এরপর দীর্ঘ ২০ বছরে এই দুই দেশ আর কখনো মুখোমুখি হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম এক অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য রেকর্ড হিসেবে এটি এখনো টিকে আছে। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও নরওয়ের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম জয়ের খোঁজ এখনো চালিয়ে যাচ্ছে ব্রাজিল। এ জয়ের আনন্দে মেতে ওঠার জন্য ব্রাজিলপ্রেমীদের অপেক্ষা করতে হবে ৬ জুলাই ভোর পর্যন্ত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন