আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ কাল

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ কাল

কিছু রাত শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখেই আবদ্ধ থাকে না, ফুটবলের ইতিহাসের পাতায় হয়ে থাকে স্মৃতিময় গদ্য। কিছু ম্যাচের ফলাফল ভুলে গেলেও কারো মাঠে নামার দৃশ্যটি থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টালে আগামীকাল নামছে তেমনই এক রাত। যে রাতে লেখা হবে ফুটবল মহাকাব্যের অমর এক উপাখ্যান। নীল-সাদা জার্সিতে, বুকের ওপর তিনটি তারকা বয়ে নিয়ে চিরচেনা ‘১০ নম্বর' জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামতে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি।

বিজ্ঞাপন

প্রতিপক্ষ বেনিন। কাগজে-কলমে এটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা কিংবা কোনো ট্রফি জয়ের লড়াই নয় । অথচ আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে ম্যাচটির গুরুত্ব কোনো ফাইনালের চেয়ে কম নয়। কারণ, এই ৯০ মিনিটের পর আর কখনো মেসিকে দেখা যাবে না আর্জেন্টিনার জার্সিতে । বাংলাদেশ সময় আগামীকাল ভোর ৫টায় শুরু হতে যাওয়া ম্যাচটি তাই এক অর্থে একটি যুগেরও শেষ দৃশ্য ।

মনুমেন্টাল প্রস্তুত তার সবচেয়ে প্রিয় তারকার বিদায়ের জন্য। প্রায় ৮৫ হাজার দর্শকের ধারণক্ষমতার এই ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম যে আবেগে ভরে উঠবে, তা টের পাওয়া গেল টিকিট বিক্রির সংখ্যায়। টিকিট বিক্রি শুরুর পর অল্প সময়েই শেষ হয়ে গেছে সব টিকিট। মাঠে থাকবেন ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যরা, তাদের পরিবার এবং মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় লেখা সতীর্থরা। এ যেন শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়, একটি প্রজন্মের নিজেদের নায়ককে শেষবার ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা।

মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্ক অবশ্য শুরু থেকেই এমন মধুর ছিল না। কিশোর বয়সে বার্সেলোনায় পাড়ি দেওয়া ছেলেটিকে নিয়ে এক সময় আর্জেন্টিনার ফুটবল কর্তাদেরই তেমন ধারণা ছিল না। স্পেন তাকে নিজেদের জার্সিতে পাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মেসির পছন্দ ছিল জন্মভূমি, প্রিয় রোজারিও। সেই সিদ্ধান্তের পর শুরু হয় এক দীর্ঘ পথচলা; যেখানে ছিল ভালোবাসা, ছিল অবিশ্বাস, ছিল তীব্র সমালোচনা, এমনকি দেশের হয়ে খেলার প্রতি তার আবেগ নিয়েও প্রশ্ন।

কিন্তু মেসির গল্পের সৌন্দর্য এখানেই। তিনি থামেননি। ফিরে এসেছেন। আবার চেষ্টা করেছেন। আবার হেরেছেন। আবার দাঁড়িয়েছেন। তারপর একদিন বদলে গেছে সবকিছু। ২০২১ কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। এরপর ২০২২ সালের ফিনালিসিমা। তারপর কাতারের সেই অবিস্মরণীয় রাত; ফ্রান্সকে হারিয়ে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়। যে ট্রফির জন্য মেসির ক্যারিয়ারকে একসময় অপূর্ণ বলা হতো, সেটিই শেষ পর্যন্ত উঠে এলো তার হাতে । এরপর ২০২৪ কোপা আমেরিকার শিরোপা যোগ করেছে আরেকটি সোনালি অধ্যায়। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি হয়ে উঠেছেন সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোল করা ফুটবলার। শেষ ম্যাচে নামার আগে তার নামের পাশে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোলের সঙ্গে ৬৮টি অ্যাসিস্ট; জাতীয় দলের ইতিহাসে আরেকটি রেকর্ড। তবু এ বিদায়ের আবেগ শুধু পরিসংখ্যানে ধরা যাবে না।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জার্সি মানেই যেন মেসি। ২০০৬ বিশ্বকাপে তরুণ বদলি হিসেবে তার আগমন থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল পর্যন্ত বিস্তৃত এক অধ্যায়। মাঝখানে বদলে গেছে সতীর্থ, কোচ, প্রতিপক্ষ, ফুটবলের কৌশল; কিন্তু থেকে গেছেন সেই ‘১০ নম্বর'। এখন সেই নম্বরটিও যেন অপেক্ষা করছে তার শেষ স্পর্শের জন্য। আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি তো সিদ্ধান্তই নিয়েছেন, মেসির বিদায়ী ম্যাচের আগে তার ১০ নম্বর জার্সি অন্য কাউকে দেওয়া হবে না।

এক সময় আর্জেন্টিনার সমর্থকদের একটি অংশের কাছে মেসি ছিলেন অপূর্ণতার প্রতীক। বার্সেলোনায় যিনি জাদু ছড়ান, জাতীয় দলের হয়ে সেই জাদু কেন দেখা যায় না—এ প্রশ্ন তাড়া করেছে বছরের পর বছর। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়; প্রতিটি ব্যর্থতার সঙ্গে তার কাঁধে জমেছে আরো ভারী বোঝা। ২০১৬ সালে জাতীয় দল থেকে সাময়িক অবসরের ঘোষণা সেই যন্ত্রণারই বহিঃপ্রকাশ ছিল।

মেসির বিদায়ের রাতে তাই আরেকটি দৃশ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ। বিশ্বকাপজয়ী দলের ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ ও লাওতারো মার্টিনেজদের কাঁধেই এখন থেকে বাড়বে দায়িত্ব। মেসির কাছ থেকে অধিনায়কের আর্মব্যান্ডও যাবে রোমেরোর হাতে। অর্থাৎ, মনুমেন্টালে শুধু একটি অধ্যায়েরই শেষ হবে না, শুরু হবে আরেকটি অধ্যায় ।

সেই নতুন অধ্যায়ের দরজায় দাঁড়িয়ে মেসি নিজেই যেন শেষবার ফিরে তাকাবেন। তার সামনে থাকবে ৯০ মিনিট বা কম-বেশি । হয়তো গোল করবেন, হয়তো করবেন না। হয়তো কোনো দুরন্ত পাসে সতীর্থকে দিয়ে গোল করাবেন। হয়তো শেষ বাঁশির আগে একবার থেমে চারপাশের গ্যালারির দিকে তাকাবেন। কিন্তু ফলাফল গৌণ। এই ম্যাচে যে মেসির আসল লড়াই প্রতিপক্ষের সঙ্গে নয়, সময়ের সঙ্গে।

বেনিনের বিপক্ষে মেসির শেষ ম্যাচটি তাই কেবল একটি প্রীতি ম্যাচ নয়। এটি সেই ছেলেটির শেষবারের মতো দেশের হয়ে মাঠে নামা, যে একদিন আর্জেন্টিনার ভালোবাসা অর্জন করতে গিয়ে নিজেকে ভেঙেছে, গড়েছে, সমালোচনা পেরিয়ে ছুঁয়েছে শিখরের মুকুট। ঘুমভাঙা চোখে অজস্র সীমান্ত অপেক্ষা করবে কেবল একটি দৃশ্যের জন্য; অধিনায়কের আর্মব্যান্ড বাহুতে জড়িয়ে মেসি বেরিয়ে আসছেন মনুমেন্টালের টানেল দিয়ে। সামনে সবুজ জমিনে আকাশি-সাদার উচ্ছ্বসিত ঢেউ। যে ঢেউয়ে লেখা হয়ে যাবে কিংবদন্তির প্রস্থান ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন