ফ্রান্সজুড়ে রাজপথে সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ, বাজেট নিয়ে চাপে ম্যাক্রোঁ সরকার

ফ্রান্সজুড়ে রাজপথে সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ, বাজেট নিয়ে চাপে ম্যাক্রোঁ সরকার

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি স্থবিরতা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার সংকোচনের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এদিন ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ রাজপথে নেমেছেন। তবে আয়োজক শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ লাখ ৭৩ হাজার।

গত সেপ্টেম্বরে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর এক দিনে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। এতে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৭ সালের বাজেট নিয়ে সংসদে অচলাবস্থা এবং সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

বিক্ষোভকারীর সংখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে ১৯৩টি স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এতে অংশ নেন ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ। রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৫ হাজার।

অন্যদিকে, আন্দোলনের অন্যতম আয়োজক শ্রমিক সংগঠন সিজিটি (সিজিটি) দাবি করেছে, সারা দেশে তাদের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১৫ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ। সংগঠনটির হিসাবে, শুধু প্যারিসেই বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার। মার্সেই, বোর্দো, লিল, তুলুজ, লিয়ঁ, নঁত ও রেনসহ বিভিন্ন শহরেও বড় জমায়েত হয়।

মজুরি বৃদ্ধি ও ব্যয় কমানোর দাবি

বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, সব শ্রেণির কর্মীর বেতন বাড়ানো, করব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং সরকারি সেবার মান উন্নয়ন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষক সংকট দূর করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও উঠেছে।

শিক্ষক, রেলকর্মী, হাসপাতালের কর্মী, ডাক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জ্বালানি খাতের শ্রমিকেরা ধর্মঘটে যোগ দেন। শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও আন্দোলনে অংশ নেন।

সিজিটি ইউনিয়নের প্রধান সোফি বেনে প্যারিসের সমাবেশে বলেন, শ্রমিকেরা জয়ী হবেন কি না, সেটি এখন আর প্রশ্ন নয়; বরং কতটা অর্জন করতে পারবেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

আলজাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে এক শিক্ষার্থী বলেন, পরিবেশগত সংকট, যুদ্ধ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয় তরুণদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। অন্যদিকে, লিল শহরের এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, বেতন বাড়ছে না, অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও সরকারি সেবার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক গ্রেপ্তার

বেশির ভাগ স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ শেষ হলেও কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্যারিস ও লিয়ঁতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বিক্ষোভ ঘিরে অন্তত ৪৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ৫৩ জন পুলিশ সদস্য। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল।

প্যারিসে বিক্ষোভের শুরুতে পরিবেশ ছিল অনেকটা উৎসবমুখর। প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকা থেকে প্লাস দ্য লা নাসিওঁ পর্যন্ত মিছিল করেন আন্দোলনকারীরা। তবে মিছিলের সামনের অংশে কয়েকজন মুখোশধারী বিক্ষোভকারীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।

লিয়ঁতে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা একদল বিক্ষোভকারীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সেখানে একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া তুলুজের কাছাকাছি একটি স্কুলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। প্যারিসের আশপাশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শিক্ষা ও পরিবহন খাতেও প্রভাব

ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে দেশটির শিক্ষা ও পরিবহন খাতে। জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৬ শতাংশ শিক্ষক ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন। বিক্ষোভের কারণে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হয়েছে।

শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, দেশটির প্রায় এক হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয় অবরোধ বা বন্ধ ছিল। তবে সরকারিভাবে বন্ধ বা অবরুদ্ধ বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮১ বলে জানানো হয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাংশেও কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

বিক্ষোভের কারণে আইফেল টাওয়ার ও আর্ক দ্য ত্রিয়ম্ফ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। তবে সামগ্রিকভাবে গণপরিবহন চলাচল তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল।

বাজেট নিয়ে সংসদে অচলাবস্থা

এই বিক্ষোভের পেছনে অন্যতম বড় কারণ ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংকট ও সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের বাজেট। দেশটির বিপুল সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি কমাতে সরকার ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু বিরোধী দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এর ফলে সাধারণ মানুষ, নিম্ন আয়ের পরিবার এবং সরকারি সেবার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভের আগের দিনই ফরাসি আইনপ্রণেতারা ২০২৭ সালের বাজেট প্রস্তাবের প্রথম অংশ প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও গভীর হয়েছে। প্রস্তাবটি এখন সিনেটে যাবে। আগামী ৯ ডিসেম্বর সেখানে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর সংসদের উভয় কক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করা হবে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বাজেট ঘাটতি কমাতে সাধারণ মানুষের সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত না করে ধনীদের সম্পদ ও বড় কোম্পানির ওপর কর বাড়ানো উচিত। এতে সরকারি সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থায়ন করা সম্ভব হবে।

সিজিটি প্রধান সোফি বেনে ইউরোনিউজকে বলেন, দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর আরোপ করে সরকারি সেবার অর্থায়ন বাড়ানো সম্ভব।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে জাতীয় বিক্ষোভ

ফ্রান্সে চলমান আন্দোলনের সূত্রপাত গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। তখন স্কুলগুলোতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শ্রেণিকক্ষের সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিসংক্রান্ত সমস্যার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন।

পরবর্তী সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব, আয়বৈষম্য ও সরকারি সেবার দুরবস্থার বিষয়গুলোও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি ধীরে ধীরে দেশজুড়ে বৃহত্তর শ্রমিক ও নাগরিক আন্দোলনে রূপ নেয়।

গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। এরপর থেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে সরকার।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও ক্ষোভের বড় কারণ

ফ্রান্সে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ফ্রান্সের বাজারেও।

পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ১ নভেম্বর দেশটির সরকার কৌশলগত মজুত থেকে ১ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়তে শুরু করে। অর্থনীতিমন্ত্রী রোলাঁ লেসকিউ জানিয়েছেন, এর ফলে বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি গড়ে ১৫ সেন্ট কমেছে। তিন হাজারের বেশি পেট্রলপাম্পে দাম কমার পরিমাণ ২০ সেন্ট পর্যন্ত হয়েছে।

তবে বিক্ষোভকারীদের মতে, জ্বালানির দাম সামান্য কমলেও সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ এখনো কমেনি।

সরকারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ

পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু আগামী সোমবার শ্রমিক সংগঠন ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সামাজিক সম্মেলনের আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন। এতে মজুরি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে, আগামী এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জনমত জরিপে ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি দলের নেতা মারিন লো পেন এগিয়ে রয়েছেন। বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁও আলোচনায় রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ পরপর তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বাজেট সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি সেবার অবনতিকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সে জনঅসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

তথ্যসূত্র: আলজাজিরা, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), লে মঁদ ও ইউরোনিউজ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন