ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদের ওপর আরো বড় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে একটি বড় ধরনের তেল চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তার দাবি, চুক্তিটির ফলে ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল তেল মজুতের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ পাবে।
গতকাল শুক্রবার চুক্তিটির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এটিকে তিনি ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেলচুক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, চুক্তিটির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে।
ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে। দেশটির দীর্ঘদিনের শাসক নিকোলা মাদুরোকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র চাপ ও কড়া নজরদারির মধ্যে রয়েছে ভেনেজুয়েলা সরকার।
মাদুরোর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে শর্ত ছিল, তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।
ভেনেজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের আগ্রহ
ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা ট্রাম্প কখনো গোপন করেননি। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে চুক্তিটির ঘোষণা দিয়ে করা এক পোস্টে তিনি বলেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুত দ্বিগুণের বেশি হবে।
তবে ভেনেজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে চুক্তিটির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।
ট্রাম্প বলেন, মার্কো রুবিও ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ‘বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে’ দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে এ চুক্তিতে পৌঁছেছেন।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এ লেনদেন ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এরই মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করবে!’
রুবিও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাহসী পররাষ্ট্রনীতি কীভাবে আমেরিকা ফার্স্ট নীতির সাফল্য বয়ে আনছে, এ চুক্তি তার প্রমাণ।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এ নীতি যুক্তরাষ্ট্রের গোলার্ধের ভেতরে স্থিতিশীল তেল মজুত ও কম দামে তেল পাওয়া নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের ভেতর গ্যাসের দাম কমিয়ে আনছে।
রুবিও আরো বলেন, ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য এ চুক্তি প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আসবে। এর ফলে উচ্চ বেতনের হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশটির অর্থনীতি পুনর্গঠনের গতি বাড়বে।
তবে এসব কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি রুবিও।
১২ তেলক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস গত বৃহস্পতিবার জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা ১২টি উৎপাদনশীল তেলক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করছিল। এসব তেলক্ষেত্রে ৯ হাজার কোটি ব্যারেল প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে।
অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, এটি ভেনেজুয়েলার মোট ৩০ হাজার কোটি ব্যারেল প্রমাণিত তেল মজুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমটি।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে দেশটির তেল মজুত দ্বিগুণের বেশি হতে পারে।
জ্বালানির দাম কমানোর চাপ
ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, চুক্তিটির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম কমবে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
এর পেছনে বড় কারণ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমছে।
এ অবস্থায় ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহে সুবিধা তৈরি করতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন।
বিনিয়োগে সতর্ক মার্কিন কোম্পানিগুলো
ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে দেশটির বেহাল অবকাঠামো বড় বাধা হয়ে আছে।
এ ছাড়া অতীতে কারাকাসের সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সম্পদ জব্দ করেছে। এ কারণে মার্কিন কোম্পানিগুলো এখনো ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগের বিষয়ে সতর্ক।
মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় ভেনেজুয়েলায় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া একমাত্র মার্কিন তেল কোম্পানি ছিল শেভরন।
গত জুলাইয়ে শেভরন জানিয়েছিল, তারা দেশটিতে অপরিশোধিত তেলের দৈনিক উৎপাদন ২ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেলে উন্নীত করেছে। ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ উৎপাদন আরো ৫০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলসম্পদের দেশ ভেনেজুয়েলায় নতুন এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি স্বার্থ আরো গভীর হওয়ার পথ তৈরি হলো।
আরএ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

