মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ- অনেক দেশেই চলছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। আর এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা।
গাজা, ইউক্রেন, সুদানসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে রেকর্ডসংখ্যক শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।
ইউনিসেফ জানায়, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৭ কোটি ৩০ লাখ শিশু যুদ্ধ আক্রান্ত এলাকায় বাস করছে। অর্থাৎ প্রতি ছয় জনের একজন এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার। ২০২৪ সালে গাজা, ইউক্রেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে হাজার হাজার শিশু নিহত হয়েছে। যুদ্ধে যেসংখ্যক শিশু নিহত হয়েছে তার চেয়ে বেশিসংখ্যক অপুষ্টিতে ভুগছে। যেতে পারছে না স্কুলে, এমনকি পাচ্ছে না টিকার মতো অতিপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা।
শনিবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, রেকর্ডসংখ্যক শিশু যুদ্ধ আক্রান্ত এলাকায় বাস করছে কিংবা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অতীতে কখনো এতসংখ্যক শিশু এভাবে আক্রান্ত হয়নি।
বিশেষ করে গাজার ওপর ইসরাইলের বর্বর হামলার প্রায় ১৫ মাসে কমপক্ষে ১৭ হাজার ৪৯২ জন শিশু নিহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এসব হামলায় গাজার বেশিরভাগ অঞ্চলই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথেরিনা রাসেল বলেন, যে কোনো হিসেবে ইউনিসেফের ইতিহাসে বলা যায়, ২০২৪ সাল ছিল শিশুদের জন্য সবচেয়ে খারাপ বছর। গাজা, ইউক্রেনসহ যুদ্ধ ও সংঘাতে লিপ্ত এলাকাগুলোতে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
ক্যাথেরিনা জানান, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর জন্য স্কুলের বাইরে থাকা, অপুষ্টিতে ভোগা এবং বাড়ি থেকে জোর করে বের করে দেওয়ার ঘটনা একেবারেই স্বাভাবিক।
সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরাইলের হামলায় গাজায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। ইউক্রেনে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে পুরো ২০২৩ সালের তুলনায় বেশি শিশু হতাহতের শিকার হয়েছে। এদিকে মধ্য অ্যামেরিকার দেশ হাইতিতে শিশুদের উপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা চলতি বছর এক হাজার ভাগ বেড়েছে। আফ্রিকার সংঘাতপ্রবণ দেশ দক্ষিণ সুদানে বিশালসংখ্যক শিশু এক বছরের বেশি সময় ধরে স্কুলে যেতে পারছে না।
ইউনিসেফ বলছে, ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার শিশুরা প্রতিদিন নানাভাবে আক্রান্ত হয়। ফলে তাদের শৈশব হারিয়ে যায়।’
গত কয়েক বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় বসবাসকারী শিশুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে যে সংখ্যা ছিল ১০ শতাংশ এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ শতাংশে। ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ সংঘাত ও সহিংসতার কারণে ৪ কোটি ৭২ লাখ শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
২০২৪ সালের বাস্তুচ্যুতির ঘটনা আরও বেড়েছে। কারণ হাইতি, লেবানন, মিয়ানমার, ফিলিস্তিনি অঞ্চল এবং সুদানের মতো দেশে তীব্র হয়েছে।
এদিকে, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতাও বেড়েছে, তাদের শিক্ষার ওপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। বেড়েছে অপুষ্টির হার। শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি সশস্ত্র সংঘাত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
গাজায় ইসরাইলি বাহিনী গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি হত্যা করেছে শিশু ও নারীদের। বেঁচে থাকা প্রায় ৯৬ শতাংশ শিশু ও নারী তাদের মৌলিক পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। কারণ বিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো কষ্টকর হয়ে উঠেছে ত্রাণকর্মীদের কাছে। চলমান এই যুদ্ধ এখন শিশুদের কাছে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। এখানকার শিশুরা বোমা ও শিশুর পাশাপাশি মারা যাচ্ছে শীত ও ঠাণ্ডাজনিত রোগে।
অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজার স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলো ১৬ বছরের অবরোধ ভাঙতে গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরাইলের মূল ভূখণ্ডে অভিযান চালায়। ফিলিস্তিনিদের অভিযানে অন্তত এক হাজার একশত ৩৯ জন নিহত হন। এছাড়া অন্তত ২৪০ জন ইসরাইলিকে পণবন্দি করে গাজায় নিয়ে যায় স্বাধীনতাকামী যোদ্ধারা। এর জেরে ওই দিনই গাজায় সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরু করে ইসরাইলিরা।
চৌদ্দ মাসের ইসরাইলি আগ্রাসনে শনিবার পর্যন্ত গাজায় অন্তত ৪৫ হাজার ৪৪৮ জন নিহত হন। আহত হন আরও এক লাখ আট হাজার ৯০ ফিলিস্তিনি।
অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দীর্ঘদিন থেকেই প্রতিবেশী ইউক্রেনে রাশিয়াবিরোধী মনোভাব জোরদারের অভিযোগ করে আসছিলেন। এর ধারাবাহিতকায় রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে দুই দেশে নিয়মিতই সামরিক মহড়া চালিয়ে আসছিল। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘নাৎসিমুক্তকরণ’ ও ‘বেসামরিকীকরণ’ করার অজুহাতে ইউক্রেনে হামলা শুরু করে রাশিয়া। দুই বছরের বেশি সময় ধরে এখনো সংঘাত চলমান রয়েছে।
সুদানে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটে ২০১৯ সালে আন্দোলনের মুখে দেশটির একনায়ক ওমর আল বশির ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর দেশটির সামরিক বাহিনী বেসামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে ভাগাভাগি করে দেশ পরিচালনা করছিল। কিন্তু ২০২১ সালের অক্টোবরে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সুদানের সেনাবাহিনী। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ আল বুরহান ও আধাসামরিক র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগলোর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির জের ধরে গত বছরের এপ্রিলে দুই বাহিনীর মধ্যে সংঘাত শুরু হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

