আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কি অংশ নেবে উপসাগরীয় দেশগুলো

আমার দেশ অনলাইন

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কি অংশ নেবে উপসাগরীয় দেশগুলো

পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর রাজধানী ও শহরগুলোতে যখন ইরানের মিসাইলগুলো আঘাত হেনেছে, তা শুধু ইট-কংক্রিট ও কাঁচের স্থাপনাই ভাঙেনি। বরং এ আঘাত আরো বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সংকটের বাইরে থেকে দেশগুলো শান্তি ও স্থিতিশীলতার যে ভাবমূর্তি সতর্কতার সঙ্গে গড়েছিল, তা যেন মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়েছে।

এখন এ অঞ্চলের দেশগুলো অসম্ভব এক বাছাইয়ের মুখোমুখি হয়েছে; হয় ইসরাইলের সঙ্গে মিলে পাল্টা হামলা চালাতে হবে অথবা নিজেদের ভূখণ্ড জ্বলতে দেখেও নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকবে। তবে হামলার মুখে পড়লেও এ দেশগুলোর মধ্য থেকে আওয়াজ উঠেছে যুদ্ধে না জড়ানোর। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আগ্রাসনের জেরে ইরানের পাল্টা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দাবি উঠছে, যে যুদ্ধ এ দেশগুলো কখনোই চায়নি তাতে যেন তারা না জড়ায়।

বিজ্ঞাপন

কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জসিম বিন জাবির আল-সানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে সতর্কতা জানিয়ে বলেছেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর ‘উচিত হবে না ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর’। যদিও তেহরান জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে’।

তিনি লিখেন, ‘কেউ কেউ চাচ্ছে কাউন্সিলের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত করতে। কিন্তু যদি ইরানের সঙ্গে কাউন্সিলভুক্ত দেশগুলোর সংঘর্ষ হয়, তবে এটি উভয়পক্ষের সম্পদের ক্ষতি করবে এবং আমাদেরকে সাহায্যের নামে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া শক্তিগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করবে।’

তিনি আহ্বান জানান, জিসিসির উচিত ‘যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় একক ও ঐক্যবদ্ধভাবে পদক্ষেপ নেওয়া।’

এ মন্তব্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর বৃহত্তর মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে যে, এ যুদ্ধ তাদের নয়। কাতারের দোহাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ টাইমসের এডিটর ইন চিফ ফয়সল আল-মুদাহাকা এ বিষয়ে আলজাজিরাকে বলেন, ‘এটি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এবং এর সঙ্গে আমাদের কিছু নেই। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই এতে আমরা আটকা পড়েছি। উপসাগরীয় অঞ্চল পুরোটাই সমৃদ্ধি, উন্নতি, নিরাপত্তা ও সংলাপের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। আমরা যুদ্ধে আগ্রহী নই। নেতানিয়াহুর আদর্শ বা ইরানের আদর্শের জন্য আমরা এ যুদ্ধে জড়াতে চাই না।’

গত শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রচণ্ড আগ্রাসনের পরপরই ইরানের পাল্টা হামলার অংশ হিসেবে এ আক্রমণগুলো হয়। ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলী খামেনি ও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতা নিহত হন। পুরো দেশের সামরিক ও সরকারি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। একটি স্কুলও হামলার শিকার হয় যাতে অন্তত ১৪৮ জন নিহত হয়েছেন।

আগ্রাসনের জবাবে ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে লক্ষ্য করে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায় তেহরান। রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে এ হামলার জেরে তিনজন নিহত ও অন্তত ৫৮ জন আহত হয়েছেন। দুবাইয়ের সুউচ্চ অট্টালিকা ও বিমানবন্দর, মানামার দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ ও কুয়েতের বিমানবন্দরে মিসাইল বা তা প্রতিহতের পর ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানছে। এছাড়া দোহার কোনো কোনো মহল্লা থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, দেশটির রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে আঘাত হেনেছে ইরান। কাতার জানিয়েছে, দেশটিতে হামলায় অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছে। অপরদিকে ওমানে পাঁচজন, কুয়েতে ৩২ জন ও বাহরাইনে চারজন আহত হয়েছে। এর মধ্যেই ইসরাইল থেকে নিজেদের দূত প্রত্যাহার করে নিয়েছে আমিরাত, যা চলমান ঘটনায় দেশটির হতাশাকে প্রকাশ করেছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো এ যুদ্ধ কখনোই চায়নি। হামলার আগের সপ্তাহে ওমান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার মধ্যস্থতা করেছে। ওই সময় ওমানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, চুক্তির কাছাকাছি রয়েছেন তারা। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আগ্রাসন শুরু করে।

আল-মুদাহাকা বলেন, ওবামার সময়ের চেয়ে যেখানে ভালো একটি চুক্তির দিকে দুই পক্ষ অগ্রসর হচ্ছিল, তখন যুদ্ধ শুরু করাটা সত্যিই প্রশ্নবিদ্ধ। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-সানিও যুদ্ধ না করা বিশেষ করে উপসাগরীয় মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে এক্ষেত্রে ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

হামলার পরপরই নেতৃত্বকে হারিয়ে তেহরান ‘আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায়’ চলে গেছে মন্তব্য করেন তিনি। হামলার ক্ষেত্রে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার যুক্তিকে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অনুধাবনের ঘাটতি’ বলেন তিনি।

তিনি বলেন, জিসিসি তাদের আকাশসীমা মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনে ব্যবহৃত হওয়ার অনুমতি না দেওয়ার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় সংকটে রয়েছে উপসগারীয় দেশগুলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশগুলো এ যুদ্ধ না হওয়ার জন্য কূটনৈতিক পন্থায় নানা চেষ্টা করেছে। এখন নিজেদের শহরকে পুড়তে দেখে তারা দীর্ঘ সময় নিশ্চুপ থাকবে, তা সম্ভব নয়। নিজেদের ভূমি, জনগণ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশগুলোর সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

তবে এক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের সিদ্ধান্তমতোই পদক্ষেপ নেবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...