লিবিয়ায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ, বর্ণবাদী প্রচারণা ও ‘পুনর্বাসন ষড়যন্ত্র’ নিয়ে ছড়ানো গুজবের কারণে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন দেশটিতে বসবাসরত আফ্রিকার সাহারা-দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলোর অভিবাসীরা। আগে থেকেই অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা এসব মানুষের জীবনযাপন আরো কঠিন হয়ে উঠেছে।
রাজধানী ত্রিপোলিতে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের মাত্রা বাড়তে থাকায় তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা, প্রাণনাশের হুমকি এবং সহায়তা সংস্থার কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।
গত ১ অক্টোবরকে ত্রিপোলিতে অবস্থানরত বিদেশি অভিবাসীদের জন্য ‘শেষ সময়সীমা’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজ থেকে লিবীয়দের প্রকাশ্যে অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এসব পোস্টে বর্ণবাদী গালিগালাজের পাশাপাশি আফ্রিকার সাহারা-দক্ষিণাঞ্চলীয়, আরব ও এশীয় অভিবাসীদের অবমাননাকরভাবে উপস্থাপন করা হয়।
অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘রিফিউজি ইন লিবিয়া’ জানিয়েছে, নির্ধারিত বিক্ষোভের কয়েক দিন আগে তাদের কাছে একটি হাতে লেখা হুমকিপত্র পৌঁছায়। এর সঙ্গে একটি গুলিও ছিল। চিঠিতে কৃষ্ণাঙ্গদের লক্ষ্য করে হুমকি দেওয়া হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত ১ অক্টোবর ঘিরে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়নি। ওই সময় বেতন বকেয়া থাকার প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ দাবাইবার সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের বড় ধরনের ধর্মঘট পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। দাবাইবার নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যের সরকার (জিএনইউ) দেশটির পশ্চিমাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে।
এরপরও ২ ও ৯ অক্টোবর ত্রিপোলির শহীদ চত্বরে বিক্ষোভ করেন কয়েক ডজন মানুষ। এ সময় তাদের স্লোগান ছিল, ‘লিবিয়া লিবীয়দের জন্য’ এবং ‘পুনর্বাসন চাই না’। গত এপ্রিল থেকে ত্রিপোলির কেন্দ্রীয় এলাকায় মাসে একাধিকবার এ ধরনের বিক্ষোভ হচ্ছে। এতে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ক্রমেই বাড়ছে।
ইউরোপমুখী অভিবাসীদের বড় কেন্দ্র ত্রিপোলি
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ত্রিপোলি ও আশপাশের এলাকায় সাহারা-দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকার প্রায় ৭ লাখ মানুষ বসবাস করেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার সুদানের নাগরিক, যাঁরা যুদ্ধের কারণে নিজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন।
ইউরোপে যাওয়ার আশায় থাকা অভিবাসীদের জন্য লিবিয়ার রাজধানী এখন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানো প্রায় ১৯ হাজার অভিবাসীর ৮০ শতাংশের যাত্রা শুরু হয়েছিল লিবিয়া থেকে। তাদের ৯০ শতাংশেরও বেশি যাত্রা করেছিলেন পশ্চিম লিবিয়ার বিভিন্ন উপকূল থেকে। ত্রিপোলি ও জুয়ারার মধ্যবর্তী উপকূলীয় অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসীদের নৌযাত্রার অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে পরিচিত।
অভিবাসীদের সহায়তা কেন্দ্রে হামলা
মানব পাচারকারী চক্রের শোষণ, নির্বিচার আটক, অপহরণ, নির্যাতন ও দাসত্বের মতো গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে আগে থেকেই রয়েছেন লিবিয়ার অভিবাসীরা। জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটিতে তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের ঘটনা পদ্ধতিগত রূপ নিয়েছে। সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টার সময়ও তাদের সহিংসতার মুখে পড়তে হয়। এ পরিস্থিতির মধ্যে এখন নিজেদের বাসস্থান ও কর্মস্থলেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা।
ত্রিপোলির পূর্বাঞ্চলে বসবাসরত সিয়েরা লিওনের ৩৭ বছর বয়সী অভিবাসী অ্যালবার্ট জি বলেন, লিবীয়রা ক্রমেই অভিবাসীদের সঙ্গে যা খুশি তা করার সুযোগ পাচ্ছেন বলে তার মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তাদের আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা যেন নেই।
তিনি বলেন, অভিবাসীদের জন্য নির্যাতন ও কারাবাসের ঝুঁকি আগে থেকেই পরিচিত সমস্যা। এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জনসমাগমস্থলে যেতে না পারা এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ খুঁজে পেতে বাধার মতো দৈনন্দিন সংকট। বসন্তকালে প্রথম দফার বিক্ষোভ শুরুর পর থেকেই শত্রুতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হতে থাকে। গ্রীষ্মের শুরুতে পরিস্থিতি তাঁর কাছে সত্যিকার অর্থেই ভীতিকর হয়ে ওঠে।
গত জুনে বিপুলসংখ্যক লিবীয় প্রথমবারের মতো কথিত ‘পুনর্বাসন পরিকল্পনার’ বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, অভিবাসীরা যাতে লিবিয়া ছেড়ে যেতে না পারেন, সে জন্য জাতিসংঘের উদ্যোগে এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এ অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে। তা সত্ত্বেও ৪ জুন শত শত বিক্ষোভকারী ত্রিপোলিতে ইউএনএইচসিআরের কার্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করেন। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো লিবিয়ার জনমিতিক কাঠামো বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিক্ষোভের পাশাপাশি অভিবাসীদের ওপর হামলা এবং তাদের ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনাও ঘটে। পশ্চিম লিবিয়ার বিভিন্ন শহরে পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সাহারা-দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকার বহু মানুষকে আটক করে। এতে অনেকে কয়েক দিন ঘরের বাইরে বের হতেও ভয় পান।
গ্রীষ্মকালে অস্থিরতা কিছুটা কমলেও ছোট ছোট জমায়েত ও বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা অব্যাহত থাকে। গত ৭ সেপ্টেম্বর পশ্চিম ত্রিপোলিতে আইওএম পরিচালিত অভিবাসী সহায়তা কেন্দ্রে একদল লিবীয় হামলা চালান। এতে হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও সাহারা-দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকার অভিবাসীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
অ্যালবার্ট বলেন, কর্তৃপক্ষ যদি আইওএমের একটি শিবিরে হামলার সুযোগ দেয়, তাহলে বহু মানুষের জীবন বিপন্ন হবে। কারণ, অভিবাসীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা বলে আর কিছু থাকবে না।
কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন
হামলার পর জাতীয় ঐক্যের সরকার জানায়, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার কখনোই হামলা, ভাঙচুর কিংবা মানুষের জীবন বিপন্ন করার হুমকিকে বৈধতা দেয় না। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও সতর্ক করে সরকার। তবে হামলার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে মিডল ইস্ট আইয়ের প্রশ্নের জবাব দেয়নি লিবিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এদিকে বসন্তকালে তৈরি হওয়া ফেসবুক ও এক্সের বিভিন্ন জনপ্রিয় পেজে এখনও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে এবং বিক্ষোভে অংশ নিতে মানুষকে আহ্বান জানানো হচ্ছে। ‘লিবিয়ান নিউজ—নো টু দ্য রিসেটেলমেন্ট ইন লিবিয়া’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে প্রায় ৭৬ হাজার সদস্য রয়েছেন। ‘দ্য ত্রিপোলি অ্যাক্টিভিস্টস মুভমেন্ট’ নামের আরেকটি গ্রুপের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার। এসব গ্রুপে প্রতিদিন অভিবাসীদের লক্ষ্য করে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রকাশ করা হচ্ছে।
এই আন্দোলনের পেছনে কারা রয়েছেন এবং এর কার্যক্রম কতটা সমন্বিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে বিবিসির আগস্টের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জুনের বিক্ষোভের পেছনে অনলাইনে ছড়ানো গুজবের ভূমিকা ছিল।
অন্যদিকে আইনজীবী থুরাইয়া আল-তুয়াইবি ও সাংবাদিক সালমা আল-শাবের মতো পরিচিত ব্যক্তিরা বিভিন্ন বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারা এসব কর্মসূচিকে ‘শান্তিপূর্ণ’ বলে দাবি করলেও এর ফলে আন্দোলন আরও গতি পাচ্ছে।
লিবিয়ার মানবাধিকারকর্মী আহমেদ হামজা বলেন, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত এসব প্রচারণা এখনও অব্যাহত রয়েছে। এ ধরনের অপরাধমূলক আন্দোলনের পক্ষে প্রচার চালানো কিংবা এর সমন্বয় করার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড লিবিয়ার দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
হামজা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের মধ্যে নিষ্ক্রিয়তা, যোগসাজশ এবং সন্দেহজনক নীরবতা দেখা যাচ্ছে।
অভিবাসীরাও একই ধরনের অভিযোগ করছেন। তাদের ভাষ্য, জাতীয় ঐক্যের সরকার লিবিয়ায় তাঁদের বসবাস ও কাজ করার সুযোগ দিলেও ত্রিপোলিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকার তাদের কাজে নিয়োগও দিয়েছে।
‘লিবিয়ায় কখনো নিরাপদ বোধ করিনি’
ক্যামেরুনের এক শরণার্থী কিংসলি (ছদ্মনাম) গত চার বছর ধরে ত্রিপোলিতে বসবাস করছেন। তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, লিবিয়ায় কখনোই নিজেকে নিরাপদ মনে হয়নি তার।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে দুইবার আটক হয়েছিলেন তিনি। কিংসলির অভিযোগ, অর্থ দেওয়ার পরই তিনি মুক্তি পান। তার ভাষায়, যারা তাকে আটক করেছিল, তারা ছিল ‘অপহরণকারী’। অপরাধী চক্রের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধেও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
কিংসলি বলেন, এখন অধিকাংশ লিবীয়কেই তার কাছে হুমকি বলে মনে হয়।
অনলাইনে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার প্রধান লক্ষ্য সাহারা-দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকার মানুষ হলেও ফিলিস্তিনি, সিরীয় ও বাংলাদেশি অভিবাসীরাও এর শিকার হচ্ছেন। এসব সম্প্রদায়ের মানুষের উল্লেখযোগ্য অংশ পূর্ব লিবিয়ায় বসবাস করলেও ত্রিপোলিতেও তাদের উপস্থিতি বাড়ছে।
অভিবাসীদের অভিযোগ, বর্তমান বৈরী পরিবেশে স্থানীয়দের কাছ থেকে অধিকার লঙ্ঘন ও অসম্মানজনক আচরণের ঘটনাও বেড়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে সরাসরি ‘পুনর্বাসনবিরোধী’ আন্দোলনের সম্পর্ক না থাকলেও তাদের দুর্ভোগ কমছে না।
অ্যালবার্ট জানান, গত সপ্তাহে একটি নির্মাণস্থলে দুই দিন কাজ করেও তিনি কোনো পারিশ্রমিক পাননি। ফলে খালি পেটে তাকে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।
নতুন করে বিক্ষোভের কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। তবে ‘পুনর্বাসনবিরোধী’ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা এখনও বিরাজ করছে। পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কাও রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী আহমেদ হামজা সতর্ক করে বলেন, কর্তৃপক্ষকে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এখন পর্যন্ত বৈরী পরিস্থিতির কারণে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী ত্রিপোলি ছেড়ে যাননি। তবে কেউ কেউ বিকল্প গন্তব্যের কথা ভাবছেন।
আইওএমের স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কর্মসূচির আওতায় ২০২৫ সালে প্রায় ১৬ হাজার অভিবাসী সহায়তা পেয়েছেন। অন্যদিকে, একই বছর লিবীয় কর্তৃপক্ষ ৩৭ হাজারের বেশি অভিবাসীকে বহিষ্কার করেছে।
অ্যালবার্ট বলেন, তিউনিসিয়া বা আলজেরিয়াতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। তারপরও তিনি লিবিয়ার তুলনায় ওই দেশগুলোতে থাকতে বেশি আগ্রহী। লিবিয়ায় আগামী মাসগুলোতে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা তিনি জানেন না বলেও জানান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

