ইমরান খানের সুচিকিৎসার দাবিতে উত্তাল পাকিস্তান, রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা

ইমরান খানের সুচিকিৎসার দাবিতে উত্তাল পাকিস্তান, রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা

দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের সদস্য ও ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের সঙ্গে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের যোগাযোগ সীমিত রাখা হয়েছে। মার্চে সর্বশেষ বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় ছেলে সুলাইমান ও কাসিম খানকে ইমরান খান জানিয়েছিলেন, তার ডান চোখের প্রায় ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়েছে। চিকিৎসার বিষয়ে তার অনুরোধের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।

অন্যদিকে ইমরান খানের পরিবারে একের পর এক গ্রেপ্তার এবং রাজধানী ইসলামাবাদে ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইমরান খানের দুই ছেলে সুলাইমান ও কাসিম খান জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে (ডিডব্লিউ) বলেছেন, তাদের বাবার স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবার উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে ২৭ সেপ্টেম্বরের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ঘোষিত মার্চ সামনে রেখে কর্তৃপক্ষ ধরপাকড় বাড়িয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। ইমরানের ছেলেরা তাদের বাবার জন্য স্বাধীন চিকিৎসকদের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং নিয়মিত পরিবার ও চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুসরণ করে ইমরানকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে স্বাধীন চিকিৎসকদের দিয়ে পরীক্ষা করানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের বক্তব্যও রয়েছে। সরকার বলছে, ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তাদের মূল লক্ষ্য জনশৃঙ্খলা ও মানুষের জীবন-সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেছেন, শান্তিপূর্ণ নাগরিকরা প্রতিবাদ করতে চাইলে তাদের বাধা দেওয়া হবে না; তবে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড বা মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য হুমকি তৈরি করা হলে তা বরদাশত করা হবে না।

এর মধ্যেই ইমরান খানের তিন বোন—আলিমা খান, ডা. উজমা খান ও নরিন নিয়াজি—লাহোরে আটক হয়েছেন। তাদের ৩০ দিনের জন্য আটক রাখার আদেশে জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পিটিআই ও ইমরানের পরিবারের পক্ষ থেকে এসব আটকের প্রতিবাদ করা হয়েছে।

ইমরানের ছেলেরা বলেছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের আটক করার উদ্দেশ্য তাদের ভয় দেখানো এবং ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির আগে সমর্থকদের ওপর চাপ তৈরি করা। পিটিআই নেতা জুলফি বুখারিও বলেছেন, গ্রেপ্তার করে দলের কর্মসূচি বন্ধ করা যাবে না। এগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও দলের বক্তব্য; স্বাধীনভাবে সব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়নি।

অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার পিটিআইয়ের ‘ক্র্যাকডাউন’ বা দমন-পীড়নের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের বক্তব্য, অতীতে পিটিআইয়ের বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের একটি পিটিআই বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হয়। ২০২৩ সালে ইমরান গ্রেপ্তার হওয়ার পরও দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে সামনে রেখে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে কনটেইনার ও ব্যারিকেড বসানো হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর আগে রাজধানীর হাসপাতালগুলোকে সম্ভাব্য ‘মাস ক্যাজুয়ালটি’ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত বেড ও জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে।

পিটিআই জানিয়েছে, ইমরান খানের মুক্তি এবং রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। ফলে কর্মসূচির আগে গ্রেপ্তার, নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং হাসপাতালগুলোর বিশেষ প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

ইমরান খানের পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং তার স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবারের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। তবে ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সরকারের নিরাপত্তা প্রস্তুতির পাশাপাশি পিটিআইয়ের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা পরিস্থিতির দিকে সবার নজর আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সূত্র: ডয়চে ভেলে, ডন ও এনডিটিভি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন