রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলার রায় আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রায়ের প্রভাব পড়তে পারে গাজায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলাতেও।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন আইনজীবী আন্তোনিয়া মালভি। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা এসব মানুষের কাছে তিনি শুনেছিলেন হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ভয়াবহ বিবরণ। তাদের অনেকেরই দাবি ছিল, তারা ন্যায়বিচার চান।
জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্য হিসেবে কাজ করা মালভির ভাষ্য, সেই সাক্ষ্য থেকেই পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গড়ানো মামলার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়।
প্রায় নয় বছর পর মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে কি না, সে বিষয়ে আদালতের রায় প্রত্যাশা করা হচ্ছে। মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি গণহত্যার জন্য দায়ী করার ক্ষেত্রে এটি আদালতের প্রথম রায় হতে পারে।
দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতি
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসা রোহিঙ্গারা ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের কারণে কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েন। চলাচল, বিয়ে, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় দীর্ঘদিন ধরে নানা বিধিনিষেধের মুখে ছিলেন তারা। ১৯৭৮, ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালেও সহিংসতার কারণে বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনে তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরু করে। এর পরের কয়েক মাসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। বর্তমানে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন।
২০১৮ সালে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী দল জানায়, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিপ্রায় ছিল বলে অনুমান করার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। দলটি মিয়ানমারের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের তদন্ত ও বিচারের সুপারিশ করে।
গণহত্যার অভিযোগে গাম্বিয়ার মামলা
২০১৯ সালের নভেম্বরে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সমর্থনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে মামলা করে গাম্বিয়া। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আদালত সর্বসম্মতভাবে মিয়ানমারকে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
মামলায় গাম্বিয়ার আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের হত্যা, যৌন সহিংসতা, শিশুদের ওপর হামলা, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া এবং পালিয়ে যাওয়ার সময়ও তাঁদের ওপর আক্রমণ—সবকিছু মিলিয়ে একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার অভিপ্রায় স্পষ্ট হয়।
তাদের মতে, শুধু মানুষ হত্যা নয়, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাস্তুচ্যুত করাও গণহত্যার উদ্দেশ্য ও ব্যাপ্তি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। গণহত্যার শিকার মানুষের সংখ্যা দিয়ে অপরাধটির প্রকৃতি নির্ধারণ করা যায় না।
মিয়ানমার অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, আরসার হামলার জবাবে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছিল। দেশটির যুক্তি, রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করা নয়, বরং তাদের বিতাড়িত করাই ছিল অভিযানের উদ্দেশ্য।
গাম্বিয়ার আইনজীবীরা পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের অজুহাত গণহত্যার অভিপ্রায়কে নাকচ করে না। তাঁদের মতে, শিশু হত্যা, ব্যাপক যৌন সহিংসতা এবং পালিয়ে যাওয়া বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলার ব্যাখ্যা শুধু নিরাপত্তা অভিযান দিয়ে দেওয়া যায় না।
যৌন সহিংসতা ও গণহত্যার অভিপ্রায়
মামলায় ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। গাম্বিয়ার পক্ষের আইনজীবীদের দাবি, নারী ও কিশোরীদের লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং শিশুদের হত্যা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সামাজিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ ধ্বংসের উদ্দেশ্যের প্রমাণ।
আইনজীবী মালভির মতে, আদালত যদি এ যুক্তি গ্রহণ করেন, তাহলে গণহত্যার মূল রায়েই যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ নজির হবে।
আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা প্রমাণের জন্য শুধু ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বা নির্যাতন দেখানো যথেষ্ট নয়; কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার বিশেষ অভিপ্রায়ও প্রমাণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত অতীতের রায়ে এ অভিপ্রায় প্রমাণের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড প্রয়োগ করেছেন।
গাজা মামলাতেও পড়তে পারে প্রভাব
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ মাইকেল বেকারের মতে, রোহিঙ্গা মামলার রায় গণহত্যার অভিপ্রায় কীভাবে প্রমাণ করা হবে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা স্পষ্ট করতে পারে।
এ রায়ের প্রভাব পড়তে পারে গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার মামলাতেও। উভয় ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র সামরিক অভিযান ও নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরেছে। ফলে সশস্ত্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে গণহত্যার অভিপ্রায় নির্ধারণে আদালত কী মানদণ্ড প্রয়োগ করেন, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনকে আদালত কতটা গুরুত্ব দেন, সেটিও এ মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। গাম্বিয়া এসব প্রতিবেদনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছে, আর মিয়ানমার সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রোহিঙ্গাদের চাওয়া নাগরিকত্ব ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন
রোহিঙ্গাদের কাছে ন্যায়বিচারের অর্থ শুধু অপরাধীদের শাস্তি বা ক্ষতিপূরণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিকত্ব, পরিচয়ের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা এবং নিজ দেশে ফেরার অধিকার।
লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রায় ৫০০ শরণার্থীর ওপর চালানো জরিপে ৮৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, ন্যায়বিচারের জন্য নাগরিকত্ব এবং নিজেদের রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অধিকার জরুরি।
গাম্বিয়া আদালতের কাছে অপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন, সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া এবং পূর্ণ নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
তবে আদালতের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। আইসিজের রায় বাধ্যতামূলক হলেও তা কার্যকর করার নিজস্ব ব্যবস্থা আদালতের নেই। কোনো রাষ্ট্র রায় মানতে অস্বীকার করলে বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যেতে পারে। সেখানে মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ অংশীদার চীন ও রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতা রয়েছে।
তারপরও রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা মনে করেন, আদালতের স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করবে।
রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দলের সদস্য সালমার কথায়, ‘ন্যায়বিচার ছাড়া আমরা ফিরে যাব না।’
আরএ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


