যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনে এক জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে একটি বাল্ড ঈগলের ভাস্কর্য উপহার দিয়েছেন। উত্তর আমেরিকার স্থানীয় এই পাখি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক। ট্রাম্পের দেওয়া এই উপহারকে দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক জোরদারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবারের ওই নৈশভোজে ভিআইপি অতিথিদের সামনে ভাস্কর্যটি উন্মোচন করা হয়। ট্রাম্প বলেন, এটি ‘আমেরিকার স্বাধীন ও ঊর্ধ্বগামী চেতনার’ প্রতীক। তিনি জানান, ভাস্কর্যটির নকশা তৈরির কাজে তিনি ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প অংশ নিয়েছেন।
কূটনীতিতে উপহার বিনিময় একটি মূল্যবান, তবে কখনও কখনও জটিল বিষয়। শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের তিন দিনের শীর্ষ বৈঠকের বৃহত্তর লক্ষ্য—বিশ্বের দুই পরাশক্তির নেতার মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলা—এই উপহার বিনিময় তারই ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ একটি অংশ।
এশিয়া গ্রুপের অংশীদার ড্যানিয়েল ক্রিটেনব্রিঙ্ক বলেন, দুই নেতা জটিল বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। তবে দিনের শেষে তারা দুজনই মানুষ। তাই ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুরুত্ব রয়েছে এবং উপহার বিনিময় সেই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক হিসেবে ৩০ বছরেরও বেশি সময় কাজ করা ক্রিটেনব্রিঙ্কের বেশিরভাগ সময় কেটেছে এশিয়ায়। তার মতে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সরাসরি সম্পর্কই ‘বিশ্বের সবচেয়ে জটিল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কটিকে’ একসঙ্গে ধরে রাখার আঠার মতো কাজ করছে বলে মনে করেন তিনি।
ক্রিটেনব্রিঙ্কের মতে, ‘নেতা-পর্যায়ের কূটনীতি’কে ট্রাম্পও গুরুত্ব দেন।
ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে উপহারের উপস্থিতি
ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে উপহার একটি স্বতন্ত্র উপস্থিতি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিলাসবহুল জাম্বো জেট, খোদাই করা সোনার বার, হীরা ও রত্নখচিত সোনার আংটিসহ নানা ধরনের উপহার পেয়েছেন।
নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ওলে জ্যাকব সেন্ডিং বলেন, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির দিকে তাকালে উপহার দেওয়া—অন্তত বিস্তৃত অর্থে—তার কাজের পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে হয়।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে শি জিনপিং ঘোষণা করেন, চীনের পক্ষ থেকে আটলান্টার একটি চিড়িয়াখানাকে দুটি পান্ডা উপহার দেওয়া হবে। পাশাপাশি একটি নতুন শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি চালু করা হবে, যার আওতায় পাঁচ বছরে এক লাখ মার্কিন শিক্ষার্থী চীনে পড়াশোনার সুযোগ পাবে।
শি বলেন, জায়ান্ট পান্ডা চীনা ও আমেরিকান জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের দূত হিসেবে কাজ করেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই দুটি পান্ডা—পিং পিং ও ফু শুয়াং—তাদের নতুন আবাস জু আটলান্টায় যাবে এবং আমেরিকান জনগণের সঙ্গে দেখা করবে বলেও জানান তিনি।
তবে শি জিনপিং ট্রাম্পকে আরও কোনো উপহার দিয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে বিবিসি হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোতে উপহারের প্রচলন বেশি
বর্তমানে জাঁকজমকপূর্ণ উপহার দেওয়ার চর্চা মূলত উপসাগরীয় দেশগুলো এবং স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোর মধ্যে বেশি দেখা যায়।
সেন্ডিংয়ের সঙ্গে কূটনীতি ও উপহার বিষয়ে একটি গবেষণাপত্রের সহলেখক মর্টেন স্কুমসরুড অ্যান্ডারসন বলেন, চীনের মতো স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো অনেক বেশি দামী উপহার দেয়।
তার মতে, পশ্চিমা বিশ্বে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধের কারণে এই ঐতিহ্য অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে গেছে।
উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে থাকা এমোলুমেন্টস ধারার কথা উল্লেখ করা হয়। এই বিধানের আওতায় বিদেশি সরকারের কাছ থেকে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কত মূল্যের উপহার গ্রহণ করতে পারবেন, তার সীমা নির্ধারিত রয়েছে।
বর্তমানে সেই সীমা ৫২৫ ডলার বা ৩৯৭ পাউন্ড। এর চেয়ে বেশি মূল্যের কোনো উপহার হলে তা ফেডারেল সম্পত্তি হয়ে যায়, যদি না প্রেসিডেন্ট নিজের অর্থে সেটি কিনে নেন।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট মূল্যের বেশি কোনো উপহার দিতে হলে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যদি না তিনি ব্যক্তিগতভাবে এর মূল্য পরিশোধ করেন।
সেন্ডিং বলেন, উপহার বিনিময়ের ক্ষেত্রে অনেক নিয়ম ও প্রটোকল জড়িত। কী ধরনের উপহার দেওয়া হবে, কোথায় উপহার বিনিময় হবে, কীভাবে এবং কখন হবে—এসব বিষয় নিয়ে প্রচুর ভাবনা ও প্রক্রিয়া থাকে। পুরো বিষয়টি অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং এর সঙ্গে নিম্নস্তরে বহু সপ্তাহ ধরে আলোচনা ও সমন্বয় চলে।
অ্যান্ডারসন বলেন, এটি বিমানবন্দরে শেষ মুহূর্তে কেনা কোনো জিনিস নয়।
ওবামা-শি থেকে ব্রাউন-ওবামা
২০১৩ সালে শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাকে ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় রেডউড কাঠ দিয়ে তৈরি একটি খোদাইকৃত বেঞ্চ উপহার দিয়েছিলেন। ওই বেঞ্চে তারা দুজন সাক্ষাৎও করেছিলেন। পরে দুজন একসঙ্গে বেঞ্চটিতে বসে ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে ছবি তোলেন।
তবে উপহার বিনিময়ের সব উদাহরণ এতটা সফল নয়। ২০০৯ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ওবামাকে একটি ঐতিহাসিক দাসবিরোধী জাহাজের কাঠ দিয়ে তৈরি শোভাবর্ধক পেন হোল্ডার উপহার দিয়েছিলেন। বিপরীতে ওবামা ব্রাউনকে কিছু ডিভিডি উপহার দেন, যা যুক্তরাজ্যের ডিভিডি প্লেয়ারগুলোর জন্য উপযুক্ত ফরম্যাটে ছিল না বলে জানা যায়।
সেন্ডিং এটিকে এক ধরনের বিব্রতকর উপহার বিনিময়ের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে ব্রাউন ও ওবামা ছিলেন মিত্র দেশের নেতা। ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন—তারা এমন দুই দেশের নেতা, যাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য রয়েছে।
সেন্ডিং বলেন, ‘আপনি ভুল করতে চাইবেন না।’ তার মতে, একটি ভুল উপহার সম্ভাব্যভাবে বড় কূটনৈতিক লক্ষ্যও ভেস্তে দিতে পারে।
ঝুঁকির মুখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর এটি ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের তৃতীয় সরাসরি বৈঠক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর সম্ভাব্য বিপর্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকার মধ্যেই এই শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একই সময়ে দুই দেশ দ্রুত বিকাশমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় রয়েছে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিনের তিক্ত যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধও সাময়িক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে স্থগিত রয়েছে। এই সফরে সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও বাড়ানো হয়েছে।
এ অবস্থায় সামরিক বিমানের উড্ডয়ন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান কিংবা উপহার বিনিময়—সবকিছুরই কূটনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করেন ক্রিটেনব্রিঙ্ক।
তার ভাষায়, এসবই প্রটোকল, দৃশ্যমান বার্তা এবং উপহার বিনিময়ের অংশ। আর এসবের লক্ষ্য একটাই—স্থিতিশীল যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক বজায় রাখা।
সূত্র: বিবিসি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


