ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে বাড়ছে হতাশা

সিএনএনের প্রতিবেদন

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে বাড়ছে হতাশা

আমেরিকার শাসন ক্ষমতায় যারাই আসেন, তাদেরই বদ্ধমূল ধারণা তারা নিজ দেশের পাশাপাশি পুরো বিশ্বকে শাসন করবেন। সে হিসেবে দেশটির প্রত্যেক প্রেসিডেন্টই ভাবেন তারা পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে বদলে দেবেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পও এমন ভাবনার ঊর্ধ্বে নন। বরং তিনি অন্যদের থেকে এক কাঠি ওপরে। প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে তিনি বিশ্বকে যেটুকু পরিবর্তন করতে চেয়েছেন, এবার যেন তার মাত্রাটা আরো বেড়েছে। সে হিসেবে বলা যায়Ñতিনি তার পূর্বসূরিদের চেয়ে বিশ্ব বদলে অনেক বেশি আগ্রহী।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু দেশটির ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে এবার এ বিষয়ে খুব একটা কিছু করতে পারছেন না ট্রাম্প। টেক টাইটানদের ভয় দেখিয়ে এবং সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বা বিচারকদের দাবিয়ে রাখতে পারছেন; কিন্তু কিছু বিশ্ব মোড়লকে তো আর ধমকি দিয়ে কাজ করাতে পারবেন না। এক্ষেত্রে যা করতে হবে, তা হলো কৌশল আর কূটনীতি।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য এবার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নেমেছেন ট্রাম্প। কিন্তু সেখানেও এখন পর্যন্ত ঠিক সফলতার মুখ দেখেননি তিনি। কারণ, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঠিক মানছেন না তার কথা। যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টাকে অমান্য করে তাকে অবহেলা আর অপমানিত করছেন পুতিন। আর এ কারণে রাশিয়ার গণমাধ্যম ট্রাম্পকে চিত্রায়িত করছে নেতিবাচকভাবে। তারা বলছে, ট্রাম্প তার কথার তোড়ে সবকিছু ভাসিয়ে দিতে চাচ্ছেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হচ্ছে না।

পশ্চিমের নেতাকে যেমন বাগে আনতে পারছেন না ট্রাম্প, তেমনি এশিয়ার অর্থনীতির পরাশক্তি চীনকেও ঠিক কাবু করতে পারছেন না। তাই তো শুল্কের মতো বিষয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন তিনি। ট্রাম্প ভেবেছিলেন শুল্ক বাড়িয়ে বাণিজ্য যুদ্ধে হারিয়ে দেবেন চীনা নেতা শি জিনপিংকে। কিন্তু চীনা রাজনীতিকে ঠিক বুঝতে পারেননি তিনি। কারণ বেইজিংয়ের নেতারা কখনই আমেরিকার কাছে নতিস্বীকার করবেন না। তাই এরই মধ্যে আমেরিকা বলতে শুরু করেছে যে, বাণিজ্য সংঘাত এড়াতে চীন যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা তারা পালন করছে না।

চীনের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকেও বাণিজ্য যুদ্ধে পিছু হটেছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের এই শুল্কযুদ্ধকে গণমাধ্যম নামকরণ করেছে ‘টাকো ট্রেড’ বা ‘ট্রাম্পস অলওয়েজ চিকেনস আউট’ নামে।

সবাই ভেবেছিলেন ট্রাম্প ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর মতোই থাকবেন। প্রথম মেয়াদে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে তার পছন্দের প্রায় সবকিছুই তুলে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এখন যখন তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, তখন ট্রাম্প বুঝতে পারছেন এখানে কাজ করছে ভিন্ন কিছু। কারণ, নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করছেন শুধুমাত্র তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। পুতিনও ঠিক একই কাজ করছেন ইউক্রেনের ক্ষেত্রে। ইরানের পরমাণু চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তা হতাশ করছে ইসরাইলকে। কারণ, ইসরাইল কোনোভাবেই চুক্তির পক্ষে নয়।

গত বছর ট্রাম্প তার নির্বাচনি প্রচারের সময় বেশ গর্ব করে বলেছিলেনÑপুতিন বা জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুবই ভালো, যা বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে অমীমাংসিত ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানে জাদুকরিভাবে কাজ করবে।

মোট কথা, ট্রাম্পই প্রথম আমেরিকান নেতা নন, যিনি এ ধরনের বিভ্রান্তিতে ভুগছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারেক ওবামাও রাশিয়াকে ক্ষয়িষ্ণু আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ঘৃণা করেছেন। পুতিনকে ‘ক্লাসরুমের একজন বিরক্তিকর শিশু’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছিলেন ওবামা। আরো ব্যাপকভাবে বলা যায়, একবিংশ শতাব্দীর সব প্রেসিডেন্টই নিজেদের ‘অন্যের ভাগ্যের নির্ধারক’ বলে মনে করেছেন।

এছাড়া চার বছর আগে ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউস থেকে বিতাড়িত করে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বিশ্বজুড়ে বলে বেড়িয়েছেন যে, তিনি আমেরিকার কর্তৃত্বকে আবারও ফিরিয়ে এনেছেন।

সবশেষে বলা যায়-দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের আয়ুকাল মাত্র চার মাস। এরই মধ্যে তিনি শুল্কের হুমকি, কানাডা, গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি এবং বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তা কর্মসূচি বাতিল করেছেন। তারপরও চীন, রাশিয়া, ইসরাইল, ইউরোপ ও কানাডার নেতারা মনে করছেন ট্রাম্প নিজেকে যতটা শক্তিশালী মনে করছেন, আদতে ততটা নন। আর এ কারণেই তাকে অমান্য করলেও কিছু যায় আসে না। মোট কথা, এজন্য তাকে ‘মূল্য’ দিতে হবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন