আফ্রিকার উসমান দান ফোদিও ও বাংলার হাজী শরীয়তউল্লাহ

ভিন্ন ভূখণ্ড, অভিন্ন বিপ্লবী চেতনা—ইতিহাসের এক সুর

ভিন্ন ভূখণ্ড, অভিন্ন বিপ্লবী চেতনা—ইতিহাসের এক সুর

ইতিহাস কখনো কখনো এমন এক অদৃশ্য সেতু নির্মাণ করে, যার এক প্রান্তে থাকে আফ্রিকার বিস্তীর্ণ প্রান্তর, অন্য প্রান্তে বাংলার নদীবিধৌত জনপদ। মাঝখানে থাকে হাজার মাইলের দূরত্ব, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি; অথচ মানুষের দীর্ঘশ্বাস, বঞ্চনার কান্না আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যেন একই ভাষায় কথা বলে।

অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধ—পৃথিবীর দুই প্রান্তে আবির্ভূত হলেন দুই মানুষ। পশ্চিম আফ্রিকায় উসমান দান ফোদিও (১৭৫৪–১৮১৭), আর বাংলার মাটিতে হাজী শরীয়তউল্লাহ (১৭৮১–১৮৪০)। তারা একই সময়ের মানুষ নন, একই ভূখণ্ডের সন্তানও নন; তাদের মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের প্রমাণও নেই। তবু তাদের জীবন পাশাপাশি রাখলে মনে হয়, ইতিহাস যেন ভিন্ন দুই আকাশের নিচে একই প্রশ্ন উচ্চারণ করেছিল—ধর্ম কি কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস, নাকি অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়ানোরও এক নৈতিক শক্তি?

বিজ্ঞাপন

যখন শাসকের প্রাসাদ উঁচু হয়, অথচ সাধারণ মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ থাকে

পশ্চিম আফ্রিকার হাউসাল্যান্ডে তখন রাজ্যগুলোর শাসন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, করের বোঝা এবং ধর্মীয়-সামাজিক অসন্তোষ মানুষের জীবনকে আলোড়িত করছিল। সেই বাস্তবতার ভেতর থেকে উঠে এলেন উসমান দান ফোদিও—একজন ধর্মীয় পণ্ডিত, শিক্ষক ও সংস্কারক। তিনি কেবল মানুষের সামনে ধর্মের কথা বলেননি; শাসকের আচরণকেও ধর্মীয় ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে বিচার করেছিলেন। তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে এমন মানুষের আশ্রয় হয়ে উঠল, যারা বিদ্যমান ব্যবস্থায় নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিল।

এদিকে বাংলার আকাশেও জমছিল অন্য মেঘ। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জমিদারি ব্যবস্থায় কৃষকের ওপর খাজনার চাপ, ঔপনিবেশিক শাসনের কর্তৃত্ব এবং গ্রামীণ সমাজের নানা সংকট ক্রমে গভীর হয়ে উঠছিল। এই বাস্তবতার মধ্যে হাজী শরীয়তউল্লাহর আবির্ভাব। দীর্ঘ ধর্মীয় শিক্ষালাভের পর তিনি বাংলার মানুষের কাছে ফিরে এলেন নতুন এক আহ্বান নিয়ে—ধর্মকে ফিরিয়ে আনতে হবে তার মৌলিক বিধানে, জীবনকে মুক্ত করতে হবে তার দৃষ্টিতে ধর্মবিরোধী আচার ও কুসংস্কার থেকে।

একজনের সামনে ছিল পশ্চিম আফ্রিকার রাজশক্তি ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রশ্ন; অন্যজনের সামনে ছিল বাংলার ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি জমিদারি ও ঔপনিবেশিক সমাজের কঠিন বাস্তবতা। একজনের কণ্ঠ উঠেছিল হাউসাল্যান্ডে, অন্যজনের কণ্ঠ বাংলার জনপদে—কিন্তু দুজনের ইতিহাসেই সাধারণ মানুষের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্নটি হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তলোয়ার ওঠার আগে জেগে উঠেছিল চিন্তা

প্রতিটি বড় পরিবর্তনের আগে মানুষের মনে একটি প্রশ্ন জন্ম নেয়। যে প্রশ্ন একদিন চাপা স্বরে উচ্চারিত হয়, কালক্রমে সেটিই হয়ে উঠতে পারে জনসমাজের সম্মিলিত কণ্ঠ।

উসমান দান ফোদিওর আন্দোলনের গোড়ায় ছিল শিক্ষা, ধর্মীয় প্রচার ও শাসকদের নীতির সমালোচনা। আনুমানিক ১৭৭৪–১৭৭৫ সাল থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রচার চালাতে থাকেন। তার বক্তব্যে ধর্মীয় আদর্শের সঙ্গে শাসকদের আচরণের অসংগতি এবং সমাজের প্রচলিত কিছু রীতির সমালোচনা উঠে আসে। অনুসারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার আন্দোলনও বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য অর্জন করে।

বাংলায় হাজী শরীয়তউল্লাহর হাতে গড়ে উঠল ফরায়েজী আন্দোলন। ‘ফরায়েজী’ শব্দটি এসেছে ‘ফরজ’ থেকে—যে কর্তব্য পালন করা অবশ্যকর্তব্য। তার আহ্বান ছিল, মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে ফরজ বিধানকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং তার বিবেচনায় ইসলাম বহির্ভূত রীতিনীতি পরিহার করতে হবে। প্রায় ১৮১৮ সালে বাংলায় প্রত্যাবর্তনের পর তার সংস্কার প্রচেষ্টা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

তাদের হাতে প্রথম অস্ত্র ছিল শিক্ষা, বক্তব্য ও সংগঠন। তারা মানুষের চিন্তাজগতে পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন; কারণ মানুষ যখন নিজের অবস্থাকে নতুন করে বুঝতে শেখে, তখনই পুরোনো ব্যবস্থার ভিতরে প্রশ্নের জন্ম হয়। এখানেই দুই নেতার ইতিহাসের এক গভীর সাদৃশ্য—পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার আসনে আঘাত করে আসে না; কখনো তা শুরু হয় মানুষের বিবেকের দরজায় কড়া নেড়ে।

যখন সংস্কারের ভাষা এসে দাঁড়ায় ক্ষমতার মুখোমুখি

কিন্তু ইতিহাসের পথ সব সময় শান্ত থাকে না। যখন কোনো আন্দোলন প্রচলিত কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করে, তখন সেই প্রশ্নের উত্তর সব সময় যুক্তি দিয়ে আসে না; কখনো আসে সংঘাতের মধ্য দিয়ে।

১৮০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে উসমান দান ফোদিও তার অনুসারীদের নিয়ে গুদুতে হিজরত করেন। হাউসা শাসকদের সঙ্গে তার বিরোধ তখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে তিনি সশস্ত্র জিহাদের নেতৃত্ব দেন। ১৮০৮ সালে গোবিরের রাজধানী আলকালাওয়া দখল তার আন্দোলনের সামরিক সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে।

বাংলায় হাজী শরীয়তউল্লাহর আন্দোলনও ধর্মীয় সংস্কারের গণ্ডি অতিক্রম করে সামাজিক-অর্থনৈতিক বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়। জমিদারদের সঙ্গে ফরায়েজীদের সংঘাতের পেছনে ছিল ধর্মীয় আচার, কর্তৃত্ব এবং কৃষকদের ওপর আরোপিত বিভিন্ন আদায়ের প্রশ্ন। তার আন্দোলন সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে নতুন সংগঠিত চেতনা সৃষ্টি করে।

তবে দুটি ইতিহাসকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। উসমান দান ফোদিওর আন্দোলন সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রাম ও নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠায় পৌঁছেছিল। অন্যদিকে, হাজী শরীয়তউল্লাহর জীবদ্দশায় ফরায়েজী আন্দোলনের প্রধান পরিচয় ছিল ধর্মীয় সংস্কার; পরবর্তী সময়ে তার ছেলে দুদু মিয়ার নেতৃত্বে কৃষকসংগঠন ও জমিদারবিরোধী প্রতিরোধ আরো সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে।

ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় সংস্কার যখন সমাজের ক্ষমতাকাঠামোকে স্পর্শ করে, তখন তার অভিঘাত উপাসনালয়ের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের ভূমি, জীবিকা, অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নেও পৌঁছে যেতে পারে।

আফ্রিকার মাটিতে রাষ্ট্র, বাংলার মাটিতে আন্দোলনের উত্তরাধিকার

উসমান দান ফোদিওর আন্দোলনের পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী। তার নেতৃত্বে শুরু হওয়া সংগ্রাম থেকে গড়ে ওঠে সোকোতো খিলাফত, যা পরবর্তী সময়ে পশ্চিম আফ্রিকার বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১৮১৭ সালে তার মৃত্যু হলেও তার প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রভাব বহু দশক ধরে বিস্তৃত ছিল।

এই আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি উজ্জ্বল নাম তার কন্যা নানা আসমাউ (১৭৯৩–১৮৬৪/৬৫)। তিনি ছিলেন পণ্ডিত, কবি ও শিক্ষিকা। নারীশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার কাজ প্রমাণ করে, একটি সংস্কারমূলক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার কেবল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজের চিন্তাজগতেও প্রবাহিত হতে পারে।

বাংলায় হাজী শরীয়তউল্লাহ কোনো স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি। কিন্তু তার মৃত্যুর সঙ্গে ফরায়েজী আন্দোলনের ইতিহাস থেমে যায়নি। তার ছেলে দুদু মিয়া (১৮১৯–১৮৬২) আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং কৃষকদের সংগঠিত করে জমিদারদের সঙ্গে সংঘাতে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

একজনের উত্তরাধিকার পশ্চিম আফ্রিকায় একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছিল; অন্যজনের উত্তরাধিকার বাংলায় ধর্মীয় সংস্কার থেকে কৃষক প্রতিরোধের বিস্তৃত ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছিল। দুই জীবনের সাফল্য তাই একই মাপকাঠিতে মাপা যায় না। একজনের ইতিহাসে আছে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধ্যায়, অন্যজনের ইতিহাসে আছে সমাজের গভীরে ছড়িয়ে পড়া এক সংস্কার আন্দোলনের বীজ।

ইতিহাসের আয়নায় দুই মানুষ

তাহলে, কী আমাদের উসমান দান ফোদিও ও হাজী শরীয়তউল্লাহকে পাশাপাশি দাঁড় করাতে শেখায়? তারা এক ছিলেন না। তাদের সময় এক ছিল না, সংগ্রামের ধরনও এক ছিল না। তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের প্রমাণ নেই। কিন্তু তাদের জীবন আমাদের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলো কোনো একটি ভূখণ্ডের জন্য নির্দিষ্ট নয়।

যখন ধর্মীয় আদর্শ ও শাসকের আচরণের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়, তখন কে সেই ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলবে? যখন সাধারণ মানুষ প্রচলিত ব্যবস্থায় নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে সংকটে পড়ে, তখন কে তাদের সংগঠিত হতে সাহায্য করবে? আর যখন সংস্কারের আহ্বান সমাজের গভীরে পৌঁছে যায়, তখন তার পরিণতি কি কেবল বিশ্বাসের পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি তা নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতারও জন্ম দেয়? উসমান দান ফোদিও ও হাজী শরীয়তউল্লাহর জীবন আমাদের এসব প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।

হাউসাল্যান্ডের প্রান্তর আর বাংলার নদীর চর—দুই ভূগোলের মধ্যে ছিল বিপুল দূরত্ব। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম পাশাপাশি রাখলে মনে হয়, মানুষের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি দেশের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না। সময় বদলায়, শাসকের নাম বদলায়, সমাজের ভাষা বদলায়; তবু অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন বারবার ফিরে আসে।

হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর পুনরাবৃত্তি কোনো ঘটনার হুবহু ফিরে আসা নয়; বরং ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভূখণ্ডে মানুষের মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নের আবারও জেগে ওঠা। আর সেই কারণেই আফ্রিকার উসমান দান ফোদিও ও বাংলার হাজী শরীয়তউল্লাহকে পাশাপাশি পড়া শুধু অতীতের দুই ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা নয়—এ আমাদের বুঝতে শেখায়, ইতিহাসের দূরত্ব যতই হোক, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো একই সুরে কথা বলে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন