ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর ২০২৫ সালের শেষ দিনে এমন একটি কাজ করলেন, যা এর কিছুদিন আগেই ভারতের পুরুষ, নারী ও অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তিনি প্রকাশ্যে একজন পাকিস্তানি প্রতিনিধির সঙ্গে করমর্দন করেন।
জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিক দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দাফনের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সেখানে জড়ো হন।
বাংলাদেশের সংসদ ভবনের একটি রুমে আয়াজ সাদিক উপস্থিত থাকাকালে জয়শঙ্কর তার দিকে এগিয়ে গিয়ে দক্ষিণ এশীয় বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে করমর্দন করেন।
এ বিষয়ে পাকিস্তানের স্পিকার সাদিক বলেন, ‘তিনি আমার কাছে এসে শুভেচ্ছা জানান। আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। তিনি নিজের পরিচয় দেন এবং হাসিমুখে আমার সঙ্গে হাত মেলান। আমি যখন নিজের পরিচয় দিতে যাচ্ছিলাম, তিনি বললেন, এক্সেলেন্সি, আমি আপনাকে চিনি, পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপের একটি ম্যাচে ভারতের পুরুষ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়েরা পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। ওই টুর্নামেন্টই দেখিয়ে দিয়েছিল, দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক কতটা তিক্ত হয়ে উঠেছে।
তারও কিছুদিন আগে মে মাসে দুই দেশ লড়াইয়ে জড়ায়। যে লড়াইয়ে জয় দাবি করে দুই দেশই। এই সংঘাত যখন খেলাধুলায়ও ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা প্রমাণ করে দেয়—রাজনৈতিক উত্তেজনা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রায় প্রতিটি জনসম্মুখের সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে। জয়শঙ্করের করমর্দন সেই ধারার ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়ায়।
ভারতের কিছু বিশ্লেষক এ ঘটনাকে নেতিবাচকভাবে দেখলেও পাকিস্তানে অনেকেই এটিকে দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কের মাঝে সামান্য উষ্ণতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
ইসলামাবাদভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মুস্তাফা হায়দার সাইয়েদ বলেন, আমি মনে করি, জয়শঙ্কর ও আয়াজ সাদিকের এই সাক্ষাৎ নতুন বছরের জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। পারস্পরিক সম্মান দেখানো, কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করা এবং করমর্দন করা—এগুলো সম্পর্কের ন্যূনতম স্বাভাবিকতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর এই ন্যূনতম বিষয়টুকুও অনুপস্থিত ছিল।
পরমাণু অস্ত্রধারী এ দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই অবনতির দিকে ছিল এবং চলতি বছরের এপ্রিলে ভারত শাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে এক হামলার পর তা আরো গভীর সংকটে পড়ে। ওই হামলায় ২৬ জন নিহত হয়। ভারত এই হত্যাকাণ্ডের জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে এবং অন্যান্য পদক্ষেপের পাশাপাশি ছয় দশক পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়।
পাকিস্তান দায় অস্বীকার করলেও মে মাসের শুরুতে দুই দেশ চার দিনব্যাপী এক তীব্র আকাশযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে এই লড়াইয়ের অবসান ঘটে। পরবর্তীতে পাকিস্তান এ ভূমিকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়।
যুদ্ধ থামলেও উভয় দেশের নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে দুই দেশই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে এবং সামরিক মহড়ার আয়োজন করেছে। এই প্রেক্ষাপটে কিছু বিশ্লেষকের মতে, ঢাকায় হওয়া ওই করমর্দন তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত সরদার মাসুদ খান এই করমর্দনকে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ কূটনৈতিক ইঙ্গিত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া হঠাৎ করে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকারের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন—এটা কল্পনাও করা যায় না। এই করমর্দনের পেছনে যা-ই থাকুক না কেন, তা এই অঞ্চলের জন্য ভালো। তবে সামনে অনেক যদি আর কিন্তু রয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকার পররাষ্ট্রবিষয়ক সম্পাদক রেজাউল হাসান লস্কর এ ঘটনার গুরুত্ব খাটো করে দেখেছেন। তিনি বলেন, দুজন একই কক্ষে ছিলেন এবং এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা সাধারণত যা করেন, সেটাই করেছেন। তারা হাত মিলিয়েছেন এবং সৌজন্যমূলক কথা বলেছেন। এটি লক্ষণীয় যে, সাক্ষাতের সব ছবি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সরকারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত হয়েছে—ভারতের দিক থেকে নয়। বর্তমানে আস্থার ঘাটতির কারণে দুই পক্ষের কোনোভাবে কাছাকাছি আসা কঠিন বলেই মনে হয়।
মে মাসের সংঘাতের সবচেয়ে গভীর ও সুদূরপ্রসারী পরিণতি ছিল ভারতের সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত। সাবেক কূটনীতিক সরদার মাসুদ খান বলেন, ভারত যদি তার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে আবার সিন্ধু পানি চুক্তিতে ফিরে আসে, তাহলে সেটি হবে একটি বড় আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ এবং সম্পর্ক পুনর্গঠনের ন্যূনতম সম্ভাবনার পূর্বাভাস।
তবে লস্কর এ বিষয়ে আশাবাদী নন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা যারা অনুসরণ করছেন, তাদের কাছে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত হওয়া বিস্ময়কর হওয়ার কথা নয়। বিশেষ করে যখন দুই দেশের মধ্যে প্রায় কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগই নেই, তখন এটি উভয় পক্ষের মধ্যে একটি নতুন ও স্থায়ী বাধা হয়ে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
গত এক বছরে পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম দেশটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে ভারতের মিত্র শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পাকিস্তান ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করেছে। ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করেছে। বাস্তবতা হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার প্রকাশ্যে পাকিস্তানের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন এবং সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে উল্লেখ করেছেন।
গাজায় নিরাপত্তা তদারকির জন্য প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন একটি বিতর্কিত আন্তর্জাতিক বাহিনীতে পাকিস্তান যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেছে।
অন্যদিকে, ভারত ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। ট্রাম্প বারবার মে মাসের সংঘাতের কথা উল্লেখ করেছেন এবং পাকিস্তানের দাবিকে সমর্থন করেছেন বলে মনে হয়েছে—যেখানে বলা হয়, তারা একাধিক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতীয় পণ্যের ওপর প্রায় ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন, যেখানে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই হার তুলনামূলকভাবে ক—১৯ শতাংশ।
এই কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান যখন স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গতি পাচ্ছে, তখন ২০২৬ সালে কি নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা দেখা যেতে পারে?
পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মুস্তাফা হায়দার সাইয়েদ বলেন, উভয় দেশেরই জাতীয় স্বার্থে অন্তত ন্যূনতম পর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন। তারা একটি খুবই মৌলিক ও সীমিত এজেন্ডা নির্ধারণ করতে পারে—যেখানে নিয়মকানুন, রেডলাইন ও নিরাপত্তার সীমা স্পষ্টভাবে ঠিক করা হবে। একবার তাহলে উভয় পক্ষের সম্মতিতে একটি ন্যূনতম সংলাপ শুরু করে তা আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব।
রেজাউল হাসান লস্কর বলেন, ২০১৯ সালের পর থেকে ভারত ধারাবাহিকভাবে হামলার জবাবে প্রতিক্রিয়া আরো কঠোর করেছে এবং ২০২৫ সালের সংঘাত দেখিয়েছে—দুই পক্ষই কতদূর পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত। এই পরিস্থিতিতে অতীতে কার্যকর প্রমাণিত ব্যবস্থার মতো করে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে গোপন যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরো বলেন, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ক্ষমতা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা এবং পাকিস্তান-সৌদি আরবের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি—এসব বিষয়ই আঞ্চলিক প্রভাব ফেলছে এবং নয়াদিল্লি তার নীতি নির্ধারণে এগুলো বিবেচনায় নেবে।
মুস্তাফা হায়দার সাইয়েদ বলেন, সহিংস ঘটনার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক দোষারোপের বদলে একটি পূর্বনির্ধারিত ও পারস্পরিকভাবে সম্মত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করা হলে সেটি হবে বড় অগ্রগতি। আমি মনে করি, ভারতও বুঝতে পেরেছে যে পাকিস্তানের অস্তিত্ব অস্বীকার করে বা তাকে উপেক্ষা করে চলা সম্ভব নয়। পাকিস্তান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং ভারত এখন অন্তত ন্যূনতম পর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রাখতে বাধ্য।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

