গ্রিনল্যান্ডে ব্যাপকভাবে তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান শুরুর প্রস্তুতি চলছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার এ দাবি অস্বীকার করে গ্রিনল্যান্ড সরকার বলেছে, ব্যাপক অনুসন্ধান শুরুর পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কোম্পানি সেখানে কাজ করলেও প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
বুধবার সিএনএনকে এ কথা বলেন গ্রিনল্যান্ডের উপখনিমন্ত্রী জর্গেন হামেকেন-হলম। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর কিছু কার্যক্রম রয়েছে। তবে ব্যাপক অনুসন্ধান থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে।’
হামেকেন-হলম বলেন, দ্বীপটিতে ছোট পরিসরে বেশ কিছু অনুসন্ধান চলছে। তবে এসব প্রকল্প কার্যকর পর্যায়ে যেতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও বিপুল ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে গবেষকেরাও সতর্ক করেছেন।
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। দ্বীপটির প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে সেখানকার আইন মেনে চলতে হবে বলে জানিয়েছে ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে হওয়া চুক্তিতেও এ বিষয়ে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরো বলেছে, গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরা ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর অংশীদার অন্য দেশগুলোর বিনিয়োগকারীদের তুলনায় বাড়তি কোনো সুবিধা পাবেন না।
গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা বরফে ঢাকা। দ্বীপটির অনেক খনিজ সম্পদ আর্কটিক বৃত্তের উত্তরে দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। সেখানে প্রায় এক মাইল পুরু বরফের স্তর রয়েছে। অবকাঠামোও সীমিত। ফলে এসব সম্পদ উত্তোলন ব্যয়বহুল ও কঠিন।
হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে ফেরার পর থেকে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ ও এর প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে বারবার কথা বলে আসছেন ট্রাম্প। দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে তার হুমকিতে ইউরোপের দেশগুলো ও ন্যাটোর অংশীদারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বুধবার ভোরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহজে উত্তোলনযোগ্য তেলের পরিমাণ বিশ্বের প্রায় যেকোনো স্থানের চেয়ে অনেক বেশি।’
তবে একই দিন অ্যারিজোনায় এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার পরিকল্পনা সংবাদমাধ্যম অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরেছে। দ্বীপটি দখলে সামরিক বাহিনী পাঠানোর কথা তিনি কখনো ভাবেননি বলেও দাবি করেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘ওখানে ভুয়া সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে আমরা অনেক সমালোচনা শুনেছি। তারা বলেছিল, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এভাবে কথা বলা ভয়াবহ। মনে আছে, তারা ভেবেছিল আমি গ্রিনল্যান্ডে হামলা করতে সামরিক বাহিনী পাঠাব। আমি তা করছিলাম না। তবে ন্যাটোর কাছে বিষয়টি নিয়ে খুব জোরালোভাবে অভিযোগ জানিয়েছিলাম।’
বুধবার সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যেমনটা বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা হলো জাতীয় নিরাপত্তা।’
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প এই গুরুত্বকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সাফল্যে রূপ দিতে চান।
বহু বছর ধরেই স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলে আসছেন ট্রাম্প। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন আগে তিনি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটি দখলের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি। ওই সময় তার যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে চলতি বছরের শুরুতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে তিনি সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করেন।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। দ্বীপটি দখলের বিষয়ে ট্রাম্পের হুমকির পর সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনের লক্ষ্যেই চুক্তিটি করা হয়। ওই সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ পেয়েছে। তবে চুক্তির শুরুতেই ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
চুক্তিটি ১৯৫১ সালের একটি চুক্তিতে সীমিত কিছু পরিবর্তন এনেছে। ওই চুক্তির আওতায় ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সেনা মোতায়েনের অনুমতি রয়েছে। নতুন চুক্তিতে তেল বা গ্যাসের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উল্লেখ নেই। তবে খনিজ সম্পদ নিয়ে সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত চুক্তির পাঠে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পথও খুলে দিয়েছে। পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ড ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীন হলে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বুধবারের পোস্টে ট্রাম্প আরো লেখেন, ‘ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যেকোনো হামলা গ্রিনল্যান্ডের ওপর দিয়ে আসতে হবে। সেখানে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়মিতভাবে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা এখনো কল্পনা করা হয়নি—এমন যেকোনো অস্ত্র ধ্বংস করবে।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউস, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সিএনএন।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

