ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক পুনর্গঠনের কথা ভাবছে ফ্রান্স। সিরিয়া, আর্মেনিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন বিরোধ ছিল। এখন সেই অধ্যায় পার করে নতুন সম্পর্ক শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফ্রান্স ইউরোপের নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ ভাবনায় তুরস্ককে অন্যতম প্রধান স্তম্ভ মনে করছে। ফ্রান্সের নেতৃত্বে ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ নামের একটি ইউরোপীয় উদ্যোগ কাজ করছে। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম কোনো অ-ন্যাটো সামরিক সংস্থা, যা ইউরোপকে নিরাপত্তা গ্যারান্টি দেবে। এই উদ্যোগে তুরস্কের অংশীদারিত্ব ফ্রান্সের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ফ্রান্সের এই নীতি পরিবর্তনের পেছনে কিছু বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, রাশিয়ার সাথে তুরস্কের সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে শীতল। ২০২৩ সালের পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মধ্যে কোনো দ্বিপক্ষীয় সফর হয়নি। তুর্কি কর্মকর্তারা মস্কোর ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলো মেনে চলছেন। এছাড়া আঙ্কারা রাশিয়ার সাথে বড় গ্যাস ক্রয়ের চুক্তিগুলো আর নবায়ন করেনি।
সাবেক ফরাসি রাষ্ট্রদূত জেরার্ড আরাউ মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকে তুরস্ক যেভাবে পরিস্থিতি সামলেছে, তাতে ফ্রান্সের অনেকেই মুগ্ধ। তুরস্ক কাউকে চটায়নি, আবার কার্যকরভাবে ইউক্রেনের পাশেও দাঁড়িয়েছে। গত দুই দশকে তুরস্ক একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
জেরার্ড আরাউয়ের মতে, প্যারিসে এখন একটি জোরালো অনুভূতি কাজ করছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে একা ফেলে যাচ্ছে। ২০২৮ সালের নির্বাচনে যিনিই জয়ী হোন না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আগের মতো সম্পর্ক আর থাকবে না। ইউরোপকে রাশিয়ার চাপের মুখোমুখি হতে হবে এবং এই সমীকরণে তুরস্ক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
বর্তমানে ফ্রান্স ও তুরস্কের মধ্যে অনেক স্বার্থের মিল রয়েছে। সিরিয়ায় উভয় দেশই প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে সমর্থন দিয়েছে। লেবাননে দুই দেশই একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার চায় এবং সেখানে ইসরাইলি পদক্ষেপের বিরোধিতা করে। ইরানের বিষয়ে দুই দেশই শান্তিপূর্ণ সমাধান সমর্থন করে।
অন্যদিকে, ইসরাইল লেবানন ও এই অঞ্চলে ফ্রান্সের উপস্থিতি চায় না। তুরস্কের প্রতি ইসরাইলের আক্রমণাত্মক মনোভাবের কারণে প্যারিসের সাথেও ইসরাইলের সংকট তৈরি হচ্ছে।
আঞ্চলিক বিষয়ের বাইরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতের অংশীদারিত্ব সামনে আসছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়াসার গুলার জানিয়েছেন, আঙ্কারা ‘এসএএমপি/টি’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনতে আগ্রহী। এটি একটি ফরাসি-ইতালীয় কনসোর্টিয়াম তৈরি করে। রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যৌথ উৎপাদনের দাবির কারণে ফ্রান্স এতদিন এই বিক্রি আটকে রেখেছিল।
তবে আগামী সপ্তাহে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো সম্মেলনের আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ এই বিষয়ে পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অ্যালিস রুফো সম্প্রতি আঙ্কারা সফর করে তুর্কি কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করেছেন। এর ফলে ন্যাটো সম্মেলনে একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে।
এরই মধ্যে দুই দেশের কোম্পানিগুলো একসাথে কাজ শুরু করেছে। ফ্রান্সের শীর্ষ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান সাফরান তুরস্কের ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বায়কারের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি করেছে। এই চুক্তির ফলে বায়কারের তৈরি টিবি-২ ড্রোনে সাফরানের ‘ইউরোফ্লির’ ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সিস্টেম যুক্ত হবে। ফরাসি সরকার ড্রোন ও হেলিকপ্টার অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা আরো বাড়ানোর কথা ভাবছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গত বছর ১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করেছে। তারা ন্যাটো মিত্রদের কাছে যুদ্ধজাহাজ, ড্রোন ও গোলাবারুদ বিক্রি করছে।
জেরার্ড আরাউ বলেন, ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্পে সমস্যা রয়েছে। সম্প্রতি ফরাসি ও জার্মান কোম্পানিগুলোর বিরোধের কারণে ১১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি যুদ্ধবিমান প্রকল্প ভেস্তে গেছে। সেই তুলনায় তুর্কি অস্ত্রগুলো সস্তা এবং অনেক বেশি টেকসই। ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে যে ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য প্রচুর পরিমাণে সস্তা অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, যা তুরস্কের আছে।
তবে ফরাসি থিংক-ট্যাংক আইএফআরআই-এর কর্মকর্তা ডোরোথি শ্মিড এই সম্পর্ক নিয়ে কিছুটা হতাশ। তিনি মনে করেন, ফ্রান্স মনে করে তুরস্ক একটি স্বৈরতান্ত্রিক পথে হাঁটছে। তুরস্ক কেবল নিজের স্বার্থের নীতি অনুসরণ করছে, যা ইউরোপীয়দের স্বার্থের সাথে মেলে না। মাক্রোঁ ২০২২ সাল থেকে এরদোয়ানের বারবার আমন্ত্রণ সত্ত্বেও আঙ্কারা সফর এড়িয়ে গেছেন।
সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র জানায়, আঙ্কারা যদি আর্মেনিয়ার সাথে তাদের সীমান্ত খুলে দেয়, তবে মাক্রোঁ একটি রাষ্ট্রীয় সফর সম্ভব হতে পারে। ফ্রান্সে বিপুল সংখ্যক আর্মেনীয় জনসংখ্যা রয়েছে। এছাড়া তুরস্কে ফরাসি দূতাবাস পরিচালিত স্কুলগুলোতে তুর্কি নাগরিকদের পড়ালেখায় আঙ্কারার নিষেধাজ্ঞা সম্পর্ককে কিছুটা তিক্ত করেছে। তুর্কি কর্মকর্তারা এই বিষয়ে একটি পারস্পরিক চুক্তি চান। দুই পক্ষ আলোচনা চালিয়ে গেলেও তাদের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে।
আরেকটি বড় ইস্যু হলো পূর্ব ভূমধ্যসাগর। গ্রিস ও ফ্রান্সের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। মাক্রোঁ এথেন্স সফরে গিয়ে গ্রিসের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। আরাউ মনে করেন, মাক্রোঁ গ্রিসের পক্ষ নিয়ে তুরস্কের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজের ‘একই সাথে সব পক্ষের সাথে সম্পর্ক রাখা’র নীতি লঙ্ঘন করেছেন।
তবে মাক্রোঁ এখন তুরস্কের সাথে সম্পর্ক উন্নত করতে চান। তুর্কি কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, তুরস্ক কখনোই গ্রিসকে আক্রমণ করবে না। ফ্রান্স মূলত গ্রিসের কাছে অস্ত্র বিক্রি করার জন্য এই সুরক্ষার ন্যারেটিভ তৈরি করছে।
সবশেষ চ্যালেঞ্জ হলো, আগামী বছরের এপ্রিলে মাক্রোঁর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তার জায়গায় ফরাসি ডানপন্থি নেতা মারিন লে পেন বা তার অনুসারী জর্ডান বারদেলা ক্ষমতায় এলে নীতি পরিবর্তন হতে পারে।
তবে সূত্র জানিয়েছে, তুরস্ক বেশ কিছুদিন ধরে মারিন লে পেনের সাথেও যোগাযোগ রাখছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


