ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই এখন শুধু স্থলযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গোয়েন্দা যুদ্ধেও বড় পরিবর্তন এসেছে। রাশিয়া ও ইরানের সহায়তায় হুথিদের যে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছিল, সেটি এখন সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর পাল্টা তৎপরতায় চাপের মুখে পড়েছে।
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলীয় ফ্রন্টে হুথিদের অগ্রগতির পেছনে শুধু তাদের জনবল কাজ করেনি। রাশিয়ার মহাকাশভিত্তিক ভূ-স্থানিক গোয়েন্দা তথ্য (জিওইন্ট) ও সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য (সিগইন্ট) ইরানের নেতৃত্বাধীন কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। এর সঙ্গে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের (এনআরএফ) ভেতরের মানব গোয়েন্দা তথ্যও যুক্ত হয়।
এই সমন্বিত ব্যবস্থায় রাশিয়ার উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তথ্য যুক্ত করা হয়। এতে এনআরএফের সদর দপ্তর, সেনাদের অবস্থান, চলাচলের পথ, যোগাযোগব্যবস্থা ও কমান্ড কাঠামোর দুর্বলতা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। পশ্চিম উপকূলে সেই তথ্যই হুথিদের সামরিক সুবিধা এনে দেয়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময়ও একই ধরনের গোয়েন্দা ব্যবস্থার ব্যবহার দেখা গেছে। রাশিয়ার জিওইন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সামরিক অবস্থান, সেনাদের চলাচল, সদর দপ্তর ও সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়। সিগইন্টের মাধ্যমে যোগাযোগের ধরন, ইলেকট্রনিক সংকেত ও কমান্ড সম্পর্কের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের উপগ্রহের তথ্য মিলিয়ে দেখা। এতে যুদ্ধক্ষেত্রের একটি স্থির ছবি নয়, বরং বাহিনীর অবস্থান ও তৎপরতার পরিবর্তনও অনুসরণ করা সম্ভব হয়। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধেই রাশিয়ার উপগ্রহ গোয়েন্দা কীভাবে ইরানের নির্ভুল হামলাকে আরো কার্যকর করতে পারে, তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
ইয়েমেনে এই গোয়েন্দা তথ্যকে হুথিদের মাঠপর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এতে কোন সদর দপ্তর কার্যকর, কোথায় সেনাদের প্রকৃত অবস্থান প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলছে না, কোন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় দুর্বল এবং কোথায় যোগাযোগে ঘাটতি রয়েছে—এসব তথ্য পাওয়া যায়। পশ্চিম উপকূলের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ার ক্ষেত্রে এসব দুর্বলতা কাজে লাগানো হয়।
এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ড (জেএফসি), এনআরএফের বিভিন্ন ইউনিট ও তাদের নিজস্ব নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল। দুটি ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়লে ওপরের দিকে ভুল তথ্য এবং নিচের দিকে বিভ্রান্তিকর নির্দেশনা পৌঁছাতে থাকে।
এর কয়েকটি উদাহরণও সামনে আসে। এনআরএফের একজন কমান্ডার অবস্থান ধরে রাখার নির্দেশ পেয়েও সরে যান। আরেকজন একটি সামরিক বিমানঘাঁটি খালি হয়ে গেছে বলে জানান, যদিও সেখানে সেনারা তখনো অবস্থান করছিল। এতে মিত্রবাহিনীর অবস্থান নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি হয় এবং হামলায় হতাহত হয়।
মোখায় থাকা সৌদি বিশেষ বাহিনীর একটি দল প্রথম বুঝতে পারে, মাঠে থাকা বাহিনীর প্রকৃত অবস্থান আর কমান্ডে পাঠানো তথ্য এক নয়। ফলে বিমান হামলার পরিকল্পনা থাকলেও মিত্রবাহিনীর অবস্থান নিশ্চিত না হয়ে তা নির্বিঘ্নে চালানো সম্ভব হচ্ছিল না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় এনআরএফের জনবল সংকট। কয়েক মাস ধরে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, বেতন পুনর্বহাল ও বাহিনী একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়ার পরও কয়েকটি ব্রিগেড সক্রিয় করার সময় নিবন্ধিত সদস্যদের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ উপস্থিত হয়নি। জাবাল আল-নারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক এলাকায় সমন্বয় ভেঙে পড়লে হুথিদের মূল বাহিনী পৌঁছানোর আগেই এনআরএফের কয়েকটি ইউনিট অবস্থান ছেড়ে দেয়।
মোখার এই অভিজ্ঞতা এখন সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর জন্য বড় শিক্ষা হয়ে উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাঞ্চলীয় ইউনিটগুলোর সঙ্গে সৌদি-ইয়েমেনি ও সৌদি-পাকিস্তানি যৌথ টার্মিনাল অ্যাটাক কন্ট্রোলার (জেটিএসি) দল যুক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মাঠের বাহিনী ও জেএফসির হামলা ব্যবস্থার মধ্যে যাচাইকৃত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
সৌদি অপারেশনাল মেন্টরিং অ্যান্ড লিয়াজোঁ টিমও ইয়েমেনি বাহিনীর জনবল, অবস্থান ও প্রস্তুতি সরাসরি যাচাই করছে। কমান্ডের পরিচয় যাচাই, আলাদা তথ্যপ্রবাহ এবং বিকল্প এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা দিয়ে মোখায় প্রকাশ পাওয়া দুর্বলতাগুলো বন্ধ করার চেষ্টা চলছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী এর আগে দক্ষিণ ইয়েমেনেও একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তাদের সামরিক কাউন্টারইন্টেলিজেন্স সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের কার্যক্রমে ব্যবহৃত কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল করে। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত বাহিনী ও তাদের মিত্র ইউনিটগুলোর কার্যক্ষমতা দ্রুত কমে যায় এবং তারা চাপের মুখে পিছু হটে।
তবে হুথিদের ক্ষেত্রে কমান্ডব্যবস্থাটি আরো জটিল। রাশিয়া উপগ্রহভিত্তিক গোয়েন্দা ও সিগন্যাল তথ্য সরবরাহ করছে। ইরান সেই তথ্য হুথিদের কমান্ড ও সামরিক কার্যক্রমে যুক্ত করছে। এই ব্যবস্থার জন্য নিরাপদ যোগাযোগ, বিশেষজ্ঞ জনবল, গোয়েন্দা তথ্য একীভূত করার কেন্দ্র এবং সানা থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের সদর দপ্তর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ প্রয়োজন।
এই ব্যবস্থাতেই এখন আঘাত করা হচ্ছে। ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে সানায় হুথিদের শীর্ষ কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় বড় ধরনের হামলা হয়। এতে অন্তত দুই মেজর জেনারেল, সাত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও ৩২ কর্নেল নিহত হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে সহযোগী, কর্মকর্তা ও যোগাযোগকর্মীদেরও অনেকে নিহত হয়েছেন।
এর প্রভাব শুধু হতাহতের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। মাঠপর্যায়ের কমান্ড দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি সানার শীর্ষ কমান্ডকেন্দ্রগুলোতে হামলা হওয়ায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া, লক্ষ্য নির্ধারণ ও হামলা চালানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
সদর দপ্তরগুলো স্থান বদল করতে বাধ্য হলে, বেঁচে থাকা কমান্ডাররা অধীনস্থ ইউনিটের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগের চেষ্টা করলে এবং ইরানের সহযোগীরা বিকল্প যোগাযোগপথ তৈরি করলে সেগুলোও নতুন গোয়েন্দা সংকেত তৈরি করে। সেগুলো শনাক্ত, বিশ্লেষণ ও অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
এ কারণেই পশ্চিম উপকূলে হুথিরা আগের মতো দ্রুত অগ্রসর হতে পারছে না বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী নিজেদের কমান্ড দুর্বলতা কাটিয়ে উঠছে। একই সময়ে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া বহিরাগত কমান্ড ও গোয়েন্দা ব্যবস্থাও ক্রমেই আঘাতের মুখে পড়ছে।
২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জেএফসির কমান্ড, যোগাযোগ, গোয়েন্দা ও যুদ্ধ সক্ষমতার সমন্বিত ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। লক্ষ্য নির্ধারণ ও গোয়েন্দা তথ্য থেকে হামলা চালানোর সময়ও কমেছে। এর সঙ্গে হুথিদের ধারাবাহিক সামরিক তৎপরতা সৌদি নীতিতে আগের সংযমও কমিয়ে দিয়েছে।
ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বড় ধরনের বিমান, স্থল ও নৌ অভিযান শুরুর আগেই হুথিদের বহিরাগত কমান্ড সহায়তা চাপের মুখে পড়েছে। পশ্চিম উপকূলে যে দুর্বল কমান্ডব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে হুথিরা সুবিধা নিয়েছিল, এবার সেই ব্যবস্থার বিপরীত পরিস্থিতিতে তাদের লড়তে হচ্ছে।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

