রোবট খাতে বিনিয়োগে শীর্ষে চীন, এগিয়ে যাচ্ছে একটি মুসলিম দেশ

রোবট খাতে বিনিয়োগে শীর্ষে চীন, এগিয়ে যাচ্ছে একটি মুসলিম দেশ

কৃষি খামার থেকে শুরু করে হাসপাতালের জটিল অপারেশন থিয়েটার—মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে রোবট তৈরির খাতে শত শত কোটি ডলারের দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ তহবিল বিনিয়োগ করেছে চীন। অভ্যন্তরীণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হ্রাস ও দ্রুত বয়স্ক হতে থাকা সমাজের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে এই খাতকে জাতীয় অগ্রাধিকারে রূপ দিয়েছে বেইজিং। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এই প্রযুক্তি পরাশক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে এই আধুনিক রোবোটিক্স খাতে দ্রুত এগিয়ে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী মুসলিম দেশ সৌদি আরব।

দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবটিক্সের তথ্যানুযায়ী, শিল্পখাতে ব্যবহার উপযোগী রোবট তৈরিতে ২০২৩ সালে জার্মানিকে পেছনে ফেলে বিশ্বে তৃতীয় স্থান দখল করে চীন। মাত্র চার বছরের মাথায় নিজেদের সক্ষমতা দ্বিগুণ করেছে দেশটি। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় বেইজিংয়ের এই বিশাল আর্থিক বরাদ্দ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কারণে বৈশ্বিক রোবটিক্সে দেশটির অগ্রগতির হিসাব রাখা এখন অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

‘মেড ইন চায়না’ উদ্যোগ ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় সরকারি তহবিল ও বিশেষ মেগা-ফান্ডের মাধ্যমে বেইজিং রোবটিক্স ও এআই খাতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। হিউম্যানয়েড (মানবীয়) রোবট খাতে বৈশ্বিক মোট স্টার্টআপ বিনিয়োগের অর্ধেকেরও বেশি এখন চীনে যাচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব রোবটিক্স (IFR)-এর তথ্যমতে, শিল্পকারখানায় প্রতি বছর সবচেয়ে বেশি নতুন রোবট যুক্ত করার ক্ষেত্রেও চীন বিশ্বের এক নম্বর।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (VC), প্রতিরক্ষা খাত (DARPA) এবং টেসলা ও বোস্টন ডায়নামিক্সের মতো বেসরকারি টেক জায়ান্টদের বিনিয়োগে এআই ও অত্যাধুনিক সফটওয়্যারচালিত রোবটিক্সে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় শীর্ষ দেশ।

ঐতিহ্যবাহী শিল্প রোবট উৎপাদন ও গবেষণায় জাপান এবং কারখানায় কর্মীদের অনুপাতে রোবটের ঘনত্বের (Robot Density) দিক থেকে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিনিয়োগকারী দেশ।

চীনে কৃষি ও চিকিৎসায় রোবটের বৈপ্লবিক অগ্রগতি

চীনে বর্তমানে সিংহভাগ কৃষকের বয়স ৫০ থেকে ৬০ বছরের কোঠায়। তরুণ প্রজন্ম কায়িক শ্রমে আগ্রহী না হওয়ায় আগামী দুই দশকের মধ্যে সম্ভাব্য মারাত্মক শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় এনভিডিয়া (NVIDIA) চিপনির্ভর বিশেষায়িত কৃষি রোবট তৈরিতে বিপুল অর্থ ঢালছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো।

শিল্প ও লজিস্টিকসের পাশাপাশি চিকিৎসা বিজ্ঞানেও এসেছে বৈপ্লবিক সাফল্য। চিকিৎসকদের সহকারী হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্মিত চীনা মেডিকেল রোবট কোয়েলের কাঁচা ডিমের খোসা সূক্ষ্মভাবে ছাড়িয়ে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। প্রস্তুতকারকদের তথ্যমতে, পশ্চিমা যন্ত্রপাতির চেয়ে প্রায় অর্ধেক খরচে মিলছে এসব মেডিকেল রোবট, যা ক্যানসার অপসারণ ও জটিল অস্ত্রোপচারে রক্তপাত এবং ঝুঁকি বহুলাংশে কমিয়ে আনে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবটিক্সের তথ্যানুযায়ী, শিল্পে ব্যবহারযোগ্য রোবট উৎপাদনে ইতিমধ্যে জার্মানিকে পেছনে ফেলে বিশ্বে তৃতীয় স্থান দখল করেছে চীন।

চীনা রোবটে ঝুঁকছে সৌদি আরব

তেলনির্ভরতা কাটিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার উদ্দেশ্যে প্রণীত 'ভিশন ২০৩০' বাস্তবায়নে চীনের এই অগ্রগতিকে কাজে লাগাতে চাইছে সৌদি আরব। দেশটির নির্মাণ খাত, লজিস্টিকস, পৌরসেবা এবং বিশেষ করে জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে রোবোটিক্স ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে যৌথ উৎপাদন অবকাঠামো গড়তে বেইজিংয়ের সঙ্গে অংশীদারিত্ব জোরদার করছে রিয়াদ।

২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, চীনের রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠান 'মিকবট' (Micbot) সৌদি আরামকোর স্থাপনাগুলোতে ব্যবহারের উপযোগী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন চার পা বিশিষ্ট রোবট প্রস্তুত করছে। এই রোবটগুলো তেলক্ষেত্র, পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা ও খনির মতো চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে সক্ষম, যার ফলে শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি ছাড়াই বিপজ্জনক এলাকাগুলোর সুরক্ষা ও সার্বক্ষণিক পরিদর্শন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর পাশাপাশি সফটব্যাংক গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে ১৫ কোটি ডলার ব্যয়ে স্বয়ংক্রিয় শিল্প রোবট কারখানা নির্মাণের উদ্যোগও নিয়েছে সৌদি প্রশাসন।

আমদানির গণ্ডি পেরিয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তরের লক্ষ্য

সৌদি ও চীনা নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও চুক্তিগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ মুসলিম এই দেশটি কেবল রোবটের আমদানিকারক ক্রেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। নিজস্ব মূলধন ও সুবিশাল অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে চীনা কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে দেশের ভেতরেই উন্নত রোবট তৈরি, গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা অর্জন করতে চায় রিয়াদ। একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৌদি তরুণদের জন্য তৈরি হবে উচ্চপ্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা বিশ্বকে টেক্কা দিয়ে চীন যখন রোবোটিক্স প্রযুক্তির বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে, ঠিক তখনই সৌদি আরবের মতো শীর্ষ মুসলিম দেশের এই খাতে এগিয়ে আসা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।

সূত্র: ডয়েচে ভেলে, ডেইলি এশিয়ান নিউজ, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ রোবোটিক্স ও চায়না রোবট ইন্ডাস্ট্রি অ্যালায়েন্স।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন