অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে একসময় হিমালয়ের মতো বিশাল পর্বতমালা ছিল—এমনই প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকেরা। প্রায় ৬৫০ থেকে ৪৫০ মিলিয়ন বছর আগে ওই অঞ্চলে বিশাল পর্বতশ্রেণি সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমানে সেই পর্বতগুলোর অধিকাংশ ক্ষয় হয়ে গেছে কিংবা বরফের নিচে তাদের ভূতাত্ত্বিক চিহ্ন চাপা পড়ে রয়েছে।
গবেষকেরা এই প্রাচীন পর্বতমালার অস্তিত্বের সন্ধান পেয়েছেন মূলত ‘জিরকন’ নামের অত্যন্ত টেকসই খনিজ কণার মাধ্যমে। জিরকনের বয়স ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে কোনো প্রাচীন শিলা কোথায় এবং কখন তৈরি হয়েছিল, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। নতুন গবেষণায় অ্যান্টার্কটিকা থেকে সংগৃহীত ১৭১২টি নতুন জিরকন নমুনা আগের গবেষণার হাজার হাজার নমুনার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
ওই সময় অ্যান্টার্কটিকার ভূতাত্ত্বিক গঠনে ‘হিমালয়-ধাঁচের’ পর্বত তৈরির প্রবল প্রমাণ রয়েছে। গন্ডোয়ানা গঠনের সময় বিভিন্ন ভূখণ্ডের সংঘর্ষে এসব বিশাল পর্বতমালা সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীকালে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষয়প্রক্রিয়ায় পাহাড়গুলো ভেঙে গেলেও তাদের ভূতাত্ত্বিক ‘শিকড়’ অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে রয়ে গেছে।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো, বিশাল পর্বতগুলোর ক্ষয়প্রক্রিয়া সমুদ্রের পরিবেশেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল। পাহাড় ক্ষয়ের ফলে ফসফরাস ও লোহার মতো পুষ্টি উপাদান সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে। এতে সামুদ্রিক অণুজীব ও শৈবালের উৎপাদন বাড়ে এবং পরবর্তী সময়ে বিপুল পরিমাণ জৈব কার্বন সমুদ্রতলে জমা হতে পারে।
গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ার ফলে জটিল জীবের বিকাশের জন্য তুলনামূলক অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তবে বিজ্ঞানীরা এটিকে প্রাচীন পর্বত, সমুদ্রের রাসায়নিক পরিবর্তন এবং জটিল প্রাণের বিকাশের মধ্যে একটি সম্ভাব্য ভূতাত্ত্বিক যোগসূত্র হিসেবে দেখছেন।
এর সঙ্গে ‘ক্যামব্রিয়ান এক্সপ্লোশন’-এরও সম্ভাব্য সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় ৫৪০ মিলিয়ন বছর আগে ক্যামব্রিয়ান যুগের শুরুতে পৃথিবীতে প্রাণীর বৈচিত্র্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তার আগের সময়ে গন্ডোয়ানার বিশাল পর্বতগুলোর ক্ষয় ও তার ফলে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন জটিল প্রাণের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচের ভূদৃশ্য নিয়ে এটি একমাত্র সাম্প্রতিক আবিষ্কার নয়। জুন ২০২৬-এ ন্যাচার জিওসায়েন্স-এ প্রকাশিত আরেক গবেষণায় পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে বিশাল ‘ফ্যান-আকৃতির’ একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষকেরা এর নাম দিয়েছেন ইস্ট অ্যান্টার্কটিক ফ্যান-শেপড বেসিন প্রভিন্স। রাডার ও অন্যান্য ভূ-ভৌত তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা দেখেছেন, বহু বিশাল ভূগর্ভস্থ অববাহিকা আসলে একটি বৃহৎ ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর অংশ।
অ্যান্টার্কটিকার ৯৯ শতাংশেরও বেশি অংশ বরফে ঢাকা। ফলে সেখানে সরাসরি ভূতাত্ত্বিক নমুনা সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন। জিরকনের মতো খনিজ এবং বরফের নিচের ভূ-তাত্ত্বিক মানচিত্র তাই বিজ্ঞানীদের কাছে অতীতের অ্যান্টার্কটিকার ভূদৃশ্য পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে নতুন গবেষণাটি অ্যান্টার্কটিকাকে শুধু বরফে ঢাকা মহাদেশ হিসেবে নয়, পৃথিবীর প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক ও জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও দেখার সুযোগ তৈরি করছে। আজকের বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা পর্বতের চিহ্ন হয়তো প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর ভূপ্রকৃতি ও জীবনের বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করছে।
সূত্র: ন্যাচার, সায়েন্স ডিরেক্ট, আনন্দবাজার ও সায়েন্স অ্যালার্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


