যুক্তরাষ্ট্রের পদত্যাগী জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড ইরান ও ভেনেজুয়েলা সংক্রান্ত মার্কিন বৈদেশিক নীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে প্রশাসনের ভেতরে ক্রমশ প্রান্তিক অবস্থানে চলে গিয়েছিলেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন মূলত তার “হস্তক্ষেপ-বিরোধী” অবস্থান, যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য এবং “আমেরিকা ফার্স্ট” রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। এই অবস্থান তাকে আগে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকে দূরে সরিয়ে রিপাবলিকান শিবিরে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ করে তুলেছিল।
ইরান ও ভেনেজুয়েলা নীতিতে মতবিরোধ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপ ও কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে গ্যাবার্ডের অবস্থান বারবার সংঘাতে জড়ায়। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে সতর্কতা জানিয়ে বলেছিলেন, বিশ্ব “পারমাণবিক ধ্বংসের ঝুঁকির কাছাকাছি” পৌঁছে গেছে। এই বক্তব্য প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি করে।
একই সময়ে তিনি কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়ে ইঙ্গিত দেন যে, ইরান তাৎক্ষণিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এমন চূড়ান্ত মূল্যায়ন গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে নিশ্চিত নয়। এই অবস্থান মার্কিন ও ইসরাইলি কঠোর অবস্থানের বিপরীতে যাওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে তার প্রভাব আরও কমে যায়।
ভেনেজুয়েলা ইস্যুতেও তার অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত ও হস্তক্ষেপবিরোধী। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু সামরিক পরিকল্পনা ও অভিযান প্রস্তুতির সময় তাকে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রশাসনের ভেতরে ‘বাইপাস’ হওয়ার অভিযোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একাধিক বড় বৈদেশিক নীতিগত সিদ্ধান্তে তাকে নিয়মিতভাবে পাশ কাটানো হয়। এমনকি জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোতে তার উপস্থিতি সীমিত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
একটি উদাহরণে বলা হয়, ভেনেজুয়েলা নিয়ে একটি মার্কিন সামরিক অভিযান সংক্রান্ত বৈঠকের সময় ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা রুবিও, সিআইএর পরিচালক ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা মার-এ-লাগোতে বৈঠকে অংশ নিলেও গ্যাবার্ড সরাসরি সেই আলোচনায় ছিলেন না।
এছাড়াও যখন ট্রাম্প ইসরাইলের সাথে যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা শুরু করেন, তখন গ্যাবার্ড ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যদের সাথে ওয়াশিংটনে ছিলেন। ট্রাম্প তখন সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান ড্যান কেইনসহ শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাথে মার-এ-লাগোতে ছিলেন।
অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে দ্বন্দ্ব
একাধিক সূত্রের দাবি, গ্যাবার্ড ও সিআইএ নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্ক ছিল টানাপোড়েনপূর্ণ। তিনি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কিছু সিদ্ধান্ত ও তথ্য বিশ্লেষণের ওপর আস্থাহীনতা প্রকাশ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, তিনি নিজের দপ্তরে সীমিত সংখ্যক উপদেষ্টার ওপর নির্ভর করতেন এবং গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের কিছু অংশের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতেন। সমালোচকদের মতে, এই অবস্থান তাকে প্রশাসনের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
তবে তার দপ্তরের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, তিনি গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা টিমের সঙ্গে সমন্বয় করেই দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তার ওপর আস্থাহীনতার অভিযোগ সঠিক নয়।
নির্বাচন-সম্পর্কিত ইস্যু ও বিতর্কিত ভূমিকা
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গ্যাবার্ড পরে কিছু সময়ের জন্য ট্রাম্পের ২০২০ সালের নির্বাচন-সংক্রান্ত অভিযোগ ও তদন্ত ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা নেন। এর মধ্যে গোয়েন্দা নথি প্রকাশ ও কিছু বিতর্কিত তদন্তমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এই ধরনের ভূমিকা তাকে ইরান ও ভেনেজুয়েলার মতো “কৌশলগত বৈদেশিক নীতি ইস্যু” থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়।
পদত্যাগ ও শেষ অধ্যায়
গ্যাবার্ড তার পদত্যাগের ঘোষণা দেন একাধিক মাস ধরে প্রশাসনের ভেতরে টানাপোড়েনের পর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার ব্যক্তিগত জীবনেও সংকট—বিশেষ করে স্বামীর অসুস্থতা—পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
পদত্যাগের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে “অসাধারণ কাজ করেছেন” বলে প্রশংসা করেন, যদিও তার প্রশাসনে থাকা সময়ে ইরান ও ভেনেজুয়েলা নীতি নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর মতবিরোধ ছিল—এ বিষয়টি প্রকাশ্যে তেমনভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্র: সিএনএন
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


