তরুণ-তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা কেন বাড়ছে

তরুণ-তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা কেন বাড়ছে

তরুণদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা বাড়ছে। তবে এর জন্য অতিরিক্ত রোগ নির্ণয়কে দায়ী করার পরিবর্তে সামাজিক পরিবর্তন, মানসিক চাপ এবং প্রয়োজনীয় সেবার অভাবের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। ইংল্যান্ডে মানসিক স্বাস্থ্য, মনোযোগের ঘাটতিজনিত অতিসক্রিয়তা (এডিএইচডি) ও অটিজম নিয়ে প্রকাশিত একটি স্বাধীন পর্যালোচনায় এমন চিত্র উঠে এসেছে।

পর্যালোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—সাধারণ মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণদের মানসিক সংকট আগের তুলনায় বেড়েছে। অধ্যাপক পিটার ফনাগি বলেছেন, এসব সমস্যার অতিরিক্ত রোগ নির্ণয় হচ্ছে বলে সাবেক ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং যে মন্তব্য করেছিলেন, তা ভুল ছিল। পরে স্ট্রিটিংও নিজের ভুল স্বীকার করেন।

বিজ্ঞাপন

তবে কিছু ডানপন্থী রাজনীতিক ও ভাষ্যকারের দাবি, স্বাভাবিক মানসিক অবস্থাকেও রোগ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতার কারণে তরুণদের চিকিৎসা ও সহায়তা চাওয়ার হার বেড়েছে। স্বাধীন পর্যালোচনার পর্যবেক্ষণ এ ধারণাকে সমর্থন করে না। বরং মানসিক সংকট বৃদ্ধির বাস্তবতা এবং সেবাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

চাহিদার তুলনায় পিছিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসার সমান গুরুত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করার ধারণাটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হলেও বাস্তবে তা এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যায় সহায়তা পেতে অনেককে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অথচ এসব দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা সরকারি পরিসংখ্যানে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।

এডিএইচডি ও অটিজম নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য অভিন্ন মানদণ্ড ও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেকেই বেসরকারি সেবার দিকে ঝুঁকছেন। কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছাড়াই এ ধরনের সেবা বাজারকে বিস্তৃত হতে দেওয়া উচিত হয়নি।

তবে সমস্যার সমাধান শুধু রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজনের ভিত্তিতে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যাতে সহায়তা পেতে কাউকে নির্দিষ্ট রোগের সনদ সংগ্রহের ওপর নির্ভর করতে না হয়।

রোগ নির্ণয় কেন সহায়তা পাওয়ার শর্ত হয়ে উঠল

মানসিক স্বাস্থ্য ও বিশেষ শিক্ষাসহায়তার ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের সনদ অনেক সময় প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সহায়তা পাওয়ার ভিত্তি হওয়া উচিত ব্যক্তির প্রয়োজন, কেবল রোগের নাম নয়।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেবার চাহিদা সক্ষমতার তুলনায় বেশি থাকায় রোগ নির্ণয়ের ভিত্তিতে সহায়তা বণ্টনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, সীমিত সেবা কারা পাবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের সনদ একধরনের বাছাইপ্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করছে।

এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে শুধু রোগ নির্ণয়ের নিয়ম সংশোধন যথেষ্ট হবে না। সেবার সক্ষমতা বাড়ানো এবং যাঁদের সহায়তা প্রয়োজন, তাদের কাছে সময়মতো তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বাড়াতে হবে বরাদ্দ

স্বাধীন পর্যালোচনায় স্বাস্থ্য ও সমাজসেবা বিভাগের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কার্যক্রমে জবাবদিহি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের আসন্ন মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলে পর্যালোচনার অন্যান্য সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আগামী ১০ বছরের জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে। এর আওতায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যায় সহায়তাকে একটি সমন্বিত সেবাব্যবস্থার অধীনে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।

অপেক্ষমাণ তালিকা ব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন হয়তো তুলনামূলক কম ব্যয়ে করা সম্ভব। কিন্তু সামগ্রিক সেবাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে নতুন অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনেক। অথচ মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের কত শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ করা উচিত, সে বিষয়ে স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়নি। একইভাবে অপেক্ষার সময়সীমা কমাতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সুপারিশও নেই।

তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের আরো সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের পর বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইয়ভেট কুপারও বিষয়টি নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম কথা বলেছেন। তরুণদের মানসিক সংকট মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন সমস্যার বাস্তবতা স্বীকার করা, সেবাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দূর করা এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা। অতিরিক্ত রোগ নির্ণয় নিয়ে বিতর্কে আটকে না থেকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসাই হওয়া উচিত সরকারের অগ্রাধিকার।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন