পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ১ লাখ ১০ হাজার ৫১৩ জন

পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ১ লাখ ১০ হাজার ৫১৩ জন

পাকিস্তানের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ১০ হাজার ৫১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৮২ হাজার ৯৮৮ জন বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে রয়েছেন। দেশটির কারাগারগুলো ধারণক্ষমতার ১৬০ শতাংশের বেশি বন্দী নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এতে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, জামিন পাওয়ার জটিলতা এবং কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির চাপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনসিএইচআর) ও জাস্টিস প্রজেক্ট পাকিস্তানের যৌথভাবে প্রস্তুত করা ‘অ্যানুয়াল প্রিজনস ডেটা রিপোর্ট ২০২৬’-এ এ চিত্র উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের কারাগারগুলোর অনুমোদিত ধারণক্ষমতা প্রায় ৬৮ হাজার ৮৩২ জন। অথচ সেখানে বন্দী রয়েছেন ১ লাখ ১০ হাজার ৫১৩ জন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার চেয়ে ৪১ হাজার ৬৮১ জন বেশি বন্দি রয়েছেন। শুধু বিচারাধীন বন্দির সংখ্যাই দেশের মোট অনুমোদিত কারা ধারণক্ষমতার চেয়ে ১৪ হাজার ১৫৬ জন বেশি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন রাবিয়া জাভেরি আগা বলেন, পাকিস্তানের সমস্যা কেবল কারাগারে অতিরিক্ত বন্দি থাকা নয়; এটি দেশটির ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন। তার মতে, বিচারব্যবস্থা যত দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে পারছে, তার চেয়ে দ্রুত মানুষ কারাগারে প্রবেশ করছে। দীর্ঘদিন আটক থাকা, বিচারকাজে বিলম্ব, জামিন পেতে প্রতিবন্ধকতা এবং কারাবাসের বিকল্প ব্যবস্থার সীমিত ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে।

মাদক সংক্রান্ত মামলায় বাড়ছে বন্দির সংখ্যা

পাকিস্তানের কারাগারগুলোতে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে আটক ব্যক্তির সংখ্যা ২৮ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটির মোট বন্দীর এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে কারাগারে রয়েছেন। ২০২৩ সালের তুলনায় মাদকসংক্রান্ত আইনে কারাবন্দীর সংখ্যা ৪৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

প্রদেশভেদে পরিস্থিতিরও পার্থক্য রয়েছে। পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে বন্দীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং সেখানে অতিরিক্ত বন্দির চাপ তীব্র। অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে বন্দির সংখ্যা কমেছে এবং এসব প্রদেশের কারাগারগুলো সামগ্রিকভাবে অনুমোদিত ধারণক্ষমতার মধ্যে রয়েছে।

প্রবেশন, প্যারোল, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ও কারাবাসের পরিবর্তে অন্যান্য ব্যবস্থা বেশি ব্যবহারের ফলে ওই দুই প্রদেশে বন্দির সংখ্যা কমাতে সহায়তা করেছে।

নারী ও শিশু বন্দিদের পরিস্থিতি

কারাগারে নারী বন্দীর সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় নারী বন্দির সংখ্যা বেড়েছে ৪৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ। কারাগারে থাকা শিশুদের মধ্যে ৮৬ দশমিক ২ শতাংশই বিচারাধীন।

অন্যদিকে পাকিস্তানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা কমে ৩ হাজার ২২০ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এ সংখ্যা ১১ দশমিক ৭ শতাংশ কম।

জাস্টিস প্রজেক্ট পাকিস্তানের নির্বাহী পরিচালক সারা বেলাল বলেন, বিচারব্যবস্থার সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়নে এ তথ্যগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।

পাকিস্তানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের অংশীদারত্ববিষয়ক প্রধান জেরোয়েন উইলেমস বলেন, রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হচ্ছে, কারাগার ব্যবস্থাপনা তারই প্রতিফলন। ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সংস্কারের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

বিচারব্যবস্থার সংস্কারের সুপারিশ

কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমাতে প্রতিবেদনে অপ্রয়োজনীয় আটক বন্ধ, জামিন ও জামিনদারসংক্রান্ত বিধান সংস্কার, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর এবং কারাবাসের বিকল্প ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি কারাগারগুলোর তদারকি জোরদার এবং অপ্রয়োজনীয় কারাবাস বাড়ায়—এমন আইন ও নীতি পর্যালোচনার কথাও বলা হয়েছে।

পাকিস্তানের কারাগারে বিচারাধীন বন্দির বিপুল সংখ্যা দেশটির বিচারপ্রক্রিয়া, জামিনব্যবস্থা এবং কারা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, ন্যায়সংগত জামিনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং কারাবাসের বিকল্প কার্যকর করা গুরুত্বপূর্ণ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন