মার্কিন রাজনীতিতে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রভাব বিস্তার করা রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ছিলেন একাধারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র, ইসরাইলের অন্যতম কট্টর সমর্থক এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপমূলক পররাষ্ট্রনীতির জোরালো প্রবক্তা। তবে তার রাজনৈতিক জীবনজুড়ে বিতর্কও ছিল সমানভাবে উপস্থিত। ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের নাটকীয় উত্থান-পতন থেকে শুরু করে গাজা, ইরান ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নিয়ে তার অবস্থান বারবার আন্তর্জাতিক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
রোববার গ্রাহামের কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, তিনি শনিবার সন্ধ্যায় মারা যান। তার পরিবার এ সময়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছে।
২০০২ সালে প্রথমবার সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার পর গ্রাহাম যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে অন্যতম প্রভাবশালী রিপাবলিকান নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। যুদ্ধপন্থী বক্তব্য এবং হস্তক্ষেপমূলক পররাষ্ট্রনীতির কারণে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।
তিনি সিনেটের বাজেট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ, আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ, পাশাপাশি ইউক্রেন ও ইরানসংক্রান্ত নীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে গ্রাহাম ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফর করেন। সেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করে রাশিয়ার ওপর আরও চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার সবচেয়ে জোরালো সমর্থকদের একজন ছিলেন। ২০২৩ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, পুতিন ইউক্রেনেই থামবেন না। ইউক্রেনে দুর্বলতা দেখানো মানে তাইওয়ানেও পরাজয় ডেকে আনা।
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের উত্থান-পতন
যদিও বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তার মতবিরোধ হয়েছিল, বিশেষ করে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটলে হামলার পর, পরে তিনি আবার ট্রাম্পের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সমর্থকে পরিণত হন এবং ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন দেন।
ক্যাপিটল হামলার পর সিনেটে দেওয়া এক বক্তব্যে গ্রাহাম বলেছিলেন, ট্রাম্প এবং আমার পথচলা ছিল ভয়ংকর। কিন্তু এভাবে এর সমাপ্তি হোক, তা চাইনি। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি যে আমাকে বাদ দিন। আর নয়।
তবে পরে তিনি অবস্থান বদলে ২০২৩ সালে বিবিসিকে বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি অন্ধকার দিক আছে... কিন্তু তিনি খুব ভালো প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আমি তার সঙ্গেই আছি, কারণ আমি দেখেছি তিনি কী করেছেন।
ইসরাইলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন
গ্রাহাম মার্কিন কংগ্রেসে ইসরাইলের অন্যতম দৃঢ় সমর্থক ছিলেন। তিনি তেল আবিবকে আরও সামরিক সহায়তা এবং অবৈধ ইহুদি বসতিগুলোর জন্য অতিরিক্ত সহায়তার পক্ষে অবস্থান নেন।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে ‘ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বলেন, ইসরাইলের প্রতি গ্রাহামের সমর্থন ছিল ‘অবিচল’।
গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা চলাকালীন তিনি ইসরাইলের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নেন এবং ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সমর্থন সীমিত করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেন।
তার মন্তব্যগুলো প্রায়ই ফিলিস্তিনি অধিকার কর্মী, মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার জন্ম দিত।
বিতর্কিত মন্তব্য
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রাহাম লিখেছিলেন, গাজার ফিলিস্তিনিরাই পৃথিবীর সবচেয়ে উগ্রপন্থী জনগোষ্ঠী,যাদের জন্ম থেকেই ইহুদিদের ঘৃণা করতে শেখানো হয়" বলে বর্ণনা করেন, যা ব্যাপক নিন্দার জন্ম দেয়।
এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানায় কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস। সংগঠনটি অভিযোগ করে, গ্রাহাম ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী ধারণা ছড়াচ্ছেন এবং তার বক্তব্য “ঘৃণায়পূর্ণ এবং অযৌক্তিক”।
এছাড়া তিনি একবার মন্তব্য করেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যেমন জাপানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল, ইসরাইলও তেমন পদক্ষেপ বিবেচনা করতে পারে। বিরোধীরা এ মন্তব্যকে উসকানিমূলক বলে সমালোচনা করেন।
২০১৯ সালে অধিকৃত গোলান মালভূমি সফরকালে গ্রাহাম বলেন, ইসরাইলের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তিনি গোলান মালভূমির ওপর ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণকে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও ইরান ইস্যু
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান প্রসিকিউটর করিম খান এ বছরের শুরুতে বলেন যে, ইসরাইলি নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির উদ্যোগের কারণে গ্রাহামসহ কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা তাকে হুমকি দিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহাম ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপেরও জোরালো সমর্থক ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত চলাকালে তিনি হোয়াইট হাউসকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে বারবার সামরিক শক্তি ব্যবহারের আহ্বান জানান এবং তেহরানের সঙ্গে সংঘাতকে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেনের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেন।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে তার অবস্থানের জন্য গ্রাহাম উপসাগরীয় দেশগুলোরও সমালোচনার শিকার হন।
গত মার্চে তিনি অভিযোগ করেন, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং যারা তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে সমর্থন দেবে না, তাদের “পরিণতি” ভোগ করতে হতে পারে বলে সতর্ক করেন।
তার এই সংঘাতমূলক আচরণ ইউরোপেও কূটনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
২০২৫ সালে, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের সাথে যুক্ত কোম্পানিগুলো থেকে নরওয়ের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের পর গ্রাহাম পরিণতির হুমকি দিলে নরওয়ের কর্মকর্তাদের পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


