ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে করা মামলায় হেরে গেলেন ট্রাম্প

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে করা মামলায় হেরে গেলেন ট্রাম্প
১৯৯৭ সালে মার-এ-লাগোতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেফ্রি এপস্টেইনের একসঙ্গে ছবি তোলার মুহূর্ত। ছবি: বিবিসি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা ১০ বিলিয়ন ডলারের মানহানির মামলা স্থায়ীভাবে খারিজ করেছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও এর মালিক রুপার্ট মারডকের বিরুদ্ধে করা এ মামলায় ট্রাম্প মানহানির অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন বলে রায় দিয়েছেন বিচারক।

বিজ্ঞাপন

শনিবার এ রায় দেন যুক্তরাষ্ট্রের জেলা আদালতের বিচারক ড্যারিন গেইলস।

বিচারক বলেন, মানহানির মামলা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় ‘প্রকৃত বিদ্বেষ’ (অ্যাকচুয়াল ম্যালিস) দেখাতে পারেননি ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, মানহানির অভিযোগ প্রমাণ করতে বাদীকে দেখাতে হয় যে বিবাদী জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করেছেন অথবা তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে ‘বেপরোয়া অবহেলা’ করেছেন।

ট্রাম্পের ১০ বিলিয়ন ডলারের মামলার বিষয়ে বিচারক গেইলস বলেন, তিনি ‘খড়কুটো আঁকড়ে ধরছেন’।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক লিখেছেন, ‘সংশোধিত অভিযোগে প্রকৃত বিদ্বেষের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, বিদ্বেষের অভিযোগগুলো অস্পষ্ট, কখনো কখনো প্রতিবেদনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ এবং বিবাদীরা তথ্যগুলো মিথ্যা জানতেন কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রায়ই অপ্রাসঙ্গিক।

বিচারক এমনও ইঙ্গিত দেন যে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ত্রুটি খুঁজে বের করতে ট্রাম্পের আইনজীবীরা ‘কৃত্রিমভাবে ত্রুটি তৈরির’ চেষ্টা করেছেন।

এপস্টিনের জন্মদিনের চিঠি নিয়ে বিতর্ক

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের যে প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে মামলাটি করা হয়েছিল, তাতে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রয়াত অর্থলগ্নিকারী ও যৌন অপরাধে দণ্ডিত জেফরি এপস্টিনের সম্পর্কের প্রসঙ্গ উঠে আসে।

২০২৫ সালের ১৭ জুলাই ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানায়, ২০০৩ সালে এপস্টিনের ৫০তম জন্মদিনে তাকে দেওয়া শুভেচ্ছাপত্রের একটি সংকলনে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ একটি চিঠি ছিল। চিঠিগুলো সংগ্রহ করেছিলেন ব্রিটিশ সমাজকর্মী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল। এপস্টিনের যৌন পাচারচক্রে জড়িত থাকার দায়ে তিনি ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের নামে থাকা চিঠিতে টাইপ করা লেখা ছিল। লেখাটির চারপাশে হাতে আঁকা এক নারীর অবয়ব ছিল, যা দেখে তাকে সুডৌল নারী বলে মনে হয়। ছবির নিচের দিকে, নারীর শ্রোণি অঞ্চলের কাছে ছিল ট্রাম্পের স্বাক্ষর।

চিঠির লেখা, স্বাক্ষর ও ছবি আঁকার দায় জোরালোভাবে অস্বীকার করেন ট্রাম্প। পরে প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি কমিটির মাধ্যমে চিঠিটির একটি অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন প্রকাশের সময় এপস্টিনের যৌন অপরাধের অভিযোগসংক্রান্ত নথি প্রকাশ না করা নিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসন তীব্র সমালোচনার মুখে ছিল। নথি প্রকাশে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা পালন করা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।

ট্রাম্প ও এপস্টিনের সম্পর্কের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন সমালোচকেরা। তাদের একসঙ্গে সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা যেত। এপস্টিন রাজনীতি, শিক্ষাঙ্গন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বলে পরিচিত ছিলেন।

২০২৫ সালে ট্রাম্প দাবি করেন, এপস্টিন তার মার-আ-লাগো রিসোর্ট থেকে নারী কর্মীদের ‘চুরি’ করার পর তিনি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

এপস্টিনের অপরাধ ও মামলা

২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় অপ্রাপ্তবয়স্ক এক কিশোরীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের জন্য অর্থ দেওয়ার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন এপস্টিন। এ ঘটনায় তিনি ১৩ মাস কারাগারে ছিলেন।

২০১৯ সালে যৌন পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফেডারেল মামলা হয়। তবে বিচার শুরুর আগেই নিউইয়র্কের কারাগারে তার মৃত্যু হয়। পরে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করা হয়।

আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের ধারণা, এপস্টিনের যৌন নিপীড়নের শিকার ব্যক্তির সংখ্যা কয়েক শ।

দ্বিতীয়বার মামলা করেও লাভ হলো না ট্রাম্পের

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ট্রাম্প সেটিকে ‘মিথ্যা, বিদ্বেষপূর্ণ ও মানহানিকর’ বলে আখ্যা দেন।

২০২৫ সালের ১৮ জুলাই মিয়ামির ফেডারেল আদালতে করা মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, পত্রিকাটি ও এর সাংবাদিকেরা ‘জেনেশুনে ও বেপরোয়া আচরণের মাধ্যমে’ অসংখ্য ‘মিথ্যা, মানহানিকর ও অবমাননাকর বক্তব্য’ প্রকাশ করেছেন। এতে তার ‘ব্যাপক আর্থিক ও সুনামের ক্ষতি’ হয়েছে বলে দাবি করেন ট্রাম্প। প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত দুই সাংবাদিককেও মামলার বিবাদী করা হয়।

এ বছরের এপ্রিলে বিচারক গেইলস মামলাটি খারিজ করে দেন। তার পর্যবেক্ষণ ছিল, প্রতিবেদনটি ‘প্রকৃত বিদ্বেষ’ থেকে তৈরি হয়েছে—এমন প্রমাণ দিতে পারেননি ট্রাম্প। তবে প্রথম রায়ে তাকে সংশোধিত অভিযোগ জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। মে মাসে নতুন করে মামলা করেন ট্রাম্প।

সংশোধিত মামলায় অভিযোগ করা হয়, চিঠিটি সাংবাদিকেরা কীভাবে পেয়েছিলেন এবং এর সত্যতা কীভাবে যাচাই করেছিলেন, তা প্রকাশ না করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বেপরোয়া আচরণ করেছে।

শনিবার মিয়ামির আদালতের রায় ট্রাম্পের এ মামলা করার প্রচেষ্টায় চূড়ান্ত বাধা হয়ে দাঁড়াল। বিচারক মামলাটি ‘উইথ প্রেজুডিস’ খারিজ করেছেন। এর অর্থ, একই বিষয়ে ভবিষ্যতে নতুন করে মামলা করার সুযোগ থাকছে না।

এ ছাড়া বিবিসি ও নিউইয়র্ক টাইমসসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আরো কয়েকটি মানহানির মামলা চলমান রয়েছে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন