২০২৫ সালে তীব্র আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হওয়া নেপালের প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা কে পি শর্মা ওলি আবারও সক্রিয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা করছেন।
৭৩ বছর বয়সী ওলি প্রায় ছয় দশক ধরে কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি চারবার নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেপ্টেম্বরে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে সহিংসতায় অন্তত ৭৭ জন নিহত হওয়ার পর তিনি পদত্যাগ করেন।
রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, আগামী ৫ মার্চের নির্বাচনে সংসদে আবারও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রচারণায় নেমেছেন ওলি। তার নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল-ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট লেনিনিস্ট জয়ের আশায় জোর প্রচার চালাচ্ছে।
তবে নিজ নির্বাচনী এলাকায় ৩৫ বছর বয়সী র্যাপার থেকে মেয়র হওয়া বালেন্দ্র শাহ-এর সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন তিনি। তরুণদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছেন শাহ।
সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন জনসভায় ওলি ভোটারদের উদ্দেশে নির্বাচনকে আখ্যা দিয়েছেন “দেশ ধ্বংসের শক্তি ও দেশ গড়ার শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা” হিসেবে।
ওলি সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্তের পর বিক্ষোভ শুরু হলেও, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিই আন্দোলনের প্রধান কারণ ছিল বলে মনে করা হয়।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সহিংসতার সময় বিক্ষোভকারীরা তার বাসভবন, সংসদ ভবন ও সরকারি দপ্তরে অগ্নিসংযোগ করলে তিনি পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি রাজনৈতিক সমাধান ও সংকট নিরসনের আশা প্রকাশ করেন।
জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত তদন্ত কমিশনের সামনে হাজির হয়ে ওলি পুলিশের গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত এক অডিও বার্তায় তিনি বলেন, “আমি গুলি চালানোর কোনো নির্দেশ দিইনি।” সহিংসতার জন্য তিনি ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘নৈরাজ্যবাদী শক্তি’কে দায়ী করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ওলির নেতৃত্বে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা রয়েছে এবং তিনি নিজের সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত মনে করতেন। সমর্থকদের কাছে ‘কেপি বা’ নামে পরিচিত এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মীদের মধ্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তা গড়ে তুলেছেন।
কৈশোরে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হন ওলি। ১৯৭৩ সালে রাজতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রেপ্তার হয়ে ১৪ বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন, যার চার বছর ছিল একাকী কারাবাস। ২০০৮ সালে নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হওয়ার আগে দেশটি এক দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা মধ্য দিয়ে যায়।
১৯৮৭ সালে মুক্তির পর তিনি সিপিএন-ইউএমএলে যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ২০১৫ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন; পরে ২০১৮ সালে পুনর্নির্বাচিত হন এবং ২০২১ সালে স্বল্প সময়ের জন্য আবার দায়িত্ব পালন করেন।
সর্বশেষ ২০২৪ সালে তিনি কেন্দ্র-বামপন্থী নেপালি কংগ্রেস-এর সঙ্গে জোট গঠন করে ক্ষমতায় ফেরেন। তবে দলটি সম্প্রতি পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা-এর পরিবর্তে ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপা-কে নতুন নেতা নির্বাচিত করেছে।
প্রায় তিন কোটি জনসংখ্যার হিমালয়বেষ্টিত এই দেশটি ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। অতীতে ওলি দুই প্রতিবেশী শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করলেও মাঝে মাঝে ভারতের বিরুদ্ধে জনমুখী বক্তব্য দিয়েছেন।
আসন্ন নির্বাচনে ওলির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে—তিনি কি আবারও ক্ষমতায় ফিরতে পারবেন, নাকি তরুণ নেতৃত্বের উত্থানে নতুন অধ্যায় শুরু হবে—সে প্রশ্ন এখন নেপালের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে।
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

