সম্ভাব্য হামলার হুমকির মুখে ব্রিটেনের একটি বিমানঘাঁটি থেকে ১২টি বি-১ বোমারু বিমান সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ওই হুমকির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এটি বড় কোনো বিষয় নয়। এছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ঘটনাটিকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, পেন্টাগন প্রয়োজন অনুযায়ী তার সামরিক সম্পদ পুনর্বণ্টন করে।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ শুরুর পর গত সাত মাসে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক শক্তির মোতায়েনের দিকে যারা নজর রেখেছেন, তাদের কাছে এটি ছিল আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ। বারবার দেখা গেছে, ট্রাম্প ও তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে বাধ্য হয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ব্রিটেন থেকে সামরিক শক্তি সরিয়ে নিতে হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ গত কয়েক মাসে আমেরিকার সামরিক ব্যবস্থার এমন অনেক দুর্বলতা সামনে এনেছে, যা এক বছর আগেও কল্পনার বাইরে ছিল। এটি ট্রাম্পের স্বেচ্ছায় শুরু করা যুদ্ধের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির তিক্ত শিক্ষা।
ট্রাম্প ইরানে হামলাকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অসাধারণ শক্তির আরেকটি প্রদর্শন হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন। এর আগে ২০২৫ সালের জুনে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় সফল বোমা হামলা এবং জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাসে তার শয়নকক্ষ থেকে আটক করার ঘটনা ঘটে। ট্রাম্প ভেবেছিলেন, ইরান যুদ্ধও সহজেই শেষ করতে পারবেন।
কিন্তু শক্তি প্রদর্শনের বিপরীতে এই যুদ্ধ মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ব্রিটেনের একটি ঘাঁটির ব্যবহারও সীমিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ ঘাঁটিতে লজিস্টিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
এখনো মার্কিন বোমারু বিমানগুলো তাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার পূর্ণ সক্ষমতা রাখে। তবে সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি উড়ে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে হবে। এতে অনেক বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় হবে।
মার্কিন রণতরীর বহরগুলো এখনো পারস্য উপসাগরের বাইরে আরব সাগরে টহল দিতে পারে। তবে সেগুলোকে দুই হাজার ২০০ মাইল দূরের ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়া থেকে রসদ ও জ্বালানি সরবরাহ করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগছে এবং বিপুল ব্যয় হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দ্রুত মার্কিন সামরিক শক্তি প্রত্যাহারের ঘটনা ইরান ও অন্যান্য প্রতিপক্ষকে এই শিক্ষা দিয়েছে যে, তারা চাইলে পরাশক্তির সামরিক শক্তির মোকাবিলা করেও নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প ও হেগসেথ ইউরোপ থেকে সেনা কমিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ব্রিটেন থেকে তাদের সেনা ও সামরিক সম্পদ সরিয়ে নিতে হয়েছে।
সোমবার মার্কিন ও ব্রিটিশ কর্মকর্তারা জানান, কমান্ডাররা সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়ার পর ব্রিটিশ ঘাঁটি থেকে বোমারু বিমানগুলো দ্রুত সরিয়ে নেন। ওই তথ্য অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত সদস্যরা ঘাঁটির সীমানার ঠিক বাইরে থেকে ড্রোন হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছিল।
সন্দেহভাজন হামলাকারীরা গত বছর ইউক্রেনের চালানো একটি দুঃসাহসী অভিযান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকতে পারেন। ওই হামলায় ইউক্রেন গোপনে রাশিয়ার গভীরে ড্রোন নিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে হামলা করে, যাতে এক ডজন বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ওই হামলা এবং অন্যান্য হামলার ঘটনায় পেন্টাগনের সামরিক দুর্বলতা সম্পর্কে ধারণায় বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার বাইরে সেনা মোতায়েন রাখাই যথেষ্ট নয়। ড্রোন ও সাইবার অস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্রই বদলে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি, প্রাথমিক সামরিক অভিযানে ইরানের পুরো নৌবাহিনী ধ্বংস করা হয়েছে এবং দেশটির জরাজীর্ণ বিমানবাহিনীও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দেশটি অর্থনৈতিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। নৌ অবরোধের কারণে দেশটির তেল রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কিন্তু এত কিছুর পরও ইরানিদের থামানো যায়নি। তারা মার্কিন বিমান ও সেনাসদস্যদের একসময় নিরাপদ বলে বিবেচিত ঘাঁটিগুলো ছেড়ে ইরান থেকে ক্রমেই দূরে সরে যেতে বাধ্য করেছে। বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাসদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব ঘাঁটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাল্লার মধ্যে।
এর মধ্যে কয়েকটি ঘাঁটি এতটাই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, পেন্টাগনের ভেতরে সেগুলো পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ নেই। কংগ্রেস অর্থ বরাদ্দ করলে এসব ঘাঁটি আরও দূরে সরিয়ে নেওয়া হবে।
জলপথের পরিস্থিতি আরো জটিল। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের কিছু অংশ দিয়ে ‘অবাধ নৌ চলাচল’ নিশ্চিত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। অথচ গত অর্ধশতাব্দী ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার অন্যতম প্রধান যুক্তি ছিল নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
বাইডেন প্রশাসনের সময়ে পেন্টাগনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতির শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডানা স্ট্রউল বলেন, এক ডজন বোমারু বিমান আকস্মিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক-উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলবে।
পেন্টাগন ইসরাইল ও জর্ডানে নতুন ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে এর জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এসব ঘাঁটি সংস্কার বা নতুন করে নির্মাণ করতে কয়েক বছর সময় লাগবে। গত বুধবার সেনাসদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় হেগসেথ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নতুন ও বিশাল সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের কথা বলেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে কথা বলেননি তিনি।
তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প যখন ইরানে হামলার ঘোষণা দেন, তখন এমন পরিকল্পনা ছিল না। তিনি কয়েক দিনের মধ্যেই বিজয় চেয়েছিলেন। পরে সেই সময়সীমা বাড়িয়ে পাঁচ বা ছয় সপ্তাহ করেন। ট্রাম্প ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর দাবি জানিয়েছিলেন এবং সংঘাত শুরুর তিন সপ্তাহের মাথায় ইরানের ‘সম্পূর্ণ পরাজয়’ ঘোষণা করেন। সর্বশেষ এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরান ‘নতিস্বীকার করবে’।
অন্যদিকে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এতে অনেক মার্কিন সেনাকে ওই অঞ্চলের বিভিন্ন হোটেল ও অফিস ভবনে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘটনায় যুদ্ধের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মার্কিন সেনারা কোথায় অবস্থান করছে, তা শনাক্ত করে ফেলে ইরান। তাদের কেউ কেউ নিরাপত্তাহীন হোটেলেও অবস্থান করছিলেন। এরপর ইরান সেসব স্থানও লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে। হামলা শুধু সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; সৌদি আরবে সিআইএর একটি স্টেশনেও হামলা হয়। তবে ইরানিরা সেটিকে লক্ষ্য করেই হামলা চালিয়েছিল, নাকি কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলা করতে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে সেটিতে আঘাত হানে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ আয়াতুল্লাহি তাবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান এখন ‘ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও লাগাতার আক্রমণাত্মক’ কৌশল নিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরো আঘাত হানতে পারে তেহরান।
কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য ক্রিস্টোফার এস. মারফি এ সপ্তাহে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল সফর করে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি দেখেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, তাকে আল-উদেইদ ঘাঁটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পেন্টাগনের এক মুখপাত্র বলেন, সফরের আগেই মারফিকে জানানো হয়েছিল, তিনি ঘাঁটিতে প্রবেশ করতে পারবেন না।
মার্কিন ঘাঁটিগুলোর বিষয়টি পেন্টাগনের জন্য এতটাই স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে যে, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামত বা পুনর্নির্মাণে কত ব্যয় হতে পারে, সে বিষয়ে কংগ্রেসকে কোনো হিসাব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তারা। আইনপ্রণেতারা বলছেন, এই ব্যয় কয়েক হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী সেন্ট্রাল কমান্ড ওই অঞ্চলে তাদের সামরিক স্থাপনাগুলো পুনর্বিন্যাস ও নতুন করে সাজানোর বিষয়ে গুরুতর পরিকল্পনা শুরু করেছে।
রোড আইল্যান্ডের সিনেটর ও আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট জ্যাক রিড গত মাসে বলেন, ‘প্রতি মাসে আর্থিক ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার করে বাড়ছে। অথচ আমরা যে গোলাবারুদ সংকটের মুখোমুখি, তা স্বীকার করছে না প্রশাসন । একই সঙ্গে ইরানের হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটিগুলো পুনর্নির্মাণের ব্যয়ও স্বীকার করছে না।’
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরকি দুর্বলতার অনেক বিষয় সামনে এনেছে যা এক বছর আগেও কল্পনার বাইরে ছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


