এল-সাইদকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দেওয়ার অভিযোগ গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে

এল-সাইদকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দেওয়ার অভিযোগ গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে সিনেট নির্বাচনের ডেমোক্রেটিক প্রার্থী আবদুল এল-সাইদকে সন্ত্রাসবাদ, ইসলামপন্থা ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত করে সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ উঠেছে ফক্স নিউজ ও নিউইয়র্ক পোস্টের বিরুদ্ধে।

এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এসব সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত শিরোনামগুলোতে এল-সাইদের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সম্পর্কের অভিযোগ তুলে ধরা হলেও, অভিযোগগুলোর পক্ষে প্রমাণ নেই এমন তথ্য খুব কমই জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নিউজকর্ডের সাংবাদিক নিমা আকরামের তৈরি বিশ্লেষণটি ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত হয়। এতে ১৪১টি সংবাদমাধ্যমে এল-সাইদকে নিয়ে প্রকাশিত ৯২০টি শিরোনাম এবং সংরক্ষিত ৭৪০টি পূর্ণাঙ্গ সংবাদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশ্লেষণের সময়সীমা ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এল-সাইদকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি শিরোনাম প্রকাশ করেছে ফক্স নিউজ—১৮১টি। নিউইয়র্ক পোস্ট প্রকাশ করেছে ১০৮টি। এরপর রয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস, যাদের শিরোনামের সংখ্যা ৫১।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এল-সাইদকে সন্ত্রাসবাদ, ইসলামপন্থা কিংবা মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত করে ৬৮টি শিরোনাম প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬টি এসেছে ফক্স নিউজ ও নিউইয়র্ক পোস্ট থেকে। অথচ এল-সাইদকে নিয়ে প্রকাশিত মোট শিরোনামের এক-তৃতীয়াংশেরও কম ছিল এই দুই সংবাদমাধ্যমের।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২৪টি শিরোনামে কোনো অভিযোগকারীর বক্তব্য উদ্ধৃত না করেই সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব ভাষায় এল-সাইদের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ বা ইসলামপন্থার সম্পর্কের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি শিরোনাম ফক্স নিউজ ও নিউইয়র্ক পোস্টের।

অন্যদিকে, ৪৫টি শিরোনামে অভিযোগগুলোকে মুসলিমবিদ্বেষী বা ভিত্তিহীন বলা হয়েছে কিংবা এল-সাইদের পাল্টা বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফক্স নিউজ ও নিউইয়র্ক পোস্টের কোনো শিরোনামই এই শ্রেণিতে পড়েনি।

অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ নেই—এ তথ্যও প্রকাশ করেছে ফক্স

মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা ফক্স নিউজের ২৬টি প্রতিবেদনের মধ্যে মাত্র দুটিতে সংবাদমাধ্যমটি নিজস্ব ভাষায় জানিয়েছে, অভিযোগটির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। নিউইয়র্ক পোস্টের এ ধরনের ১৭টি প্রতিবেদনের কোনোটিতেই এমন মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি। অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর ৭৬টি প্রতিবেদনের মধ্যে ২৯টিতে অভিযোগটির পক্ষে প্রমাণের অভাব তুলে ধরা হয়েছে।

ফক্স নিউজ ও নিউইয়র্ক পোস্ট প্রায় তিন মাস ধরে এল-সাইদ ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ ও ইসলামপন্থার সম্পর্কের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে। কিন্তু অভিযোগগুলোর ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন বা প্রমাণের অভাব সম্পর্কে পাঠকদের খুব কমই জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এল-সাইদকে ‘মুসলিম ব্রাদারহুডের লোক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তবে রাজনৈতিক তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান পলিটিফ্যাক্ট ট্রাম্পের এই দাবিকে ‘প্যান্টস অন ফায়ার’ বা সম্পূর্ণ মিথ্যা হিসেবে মূল্যায়ন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ট্রাম্পের ‘জিহাদি’ মন্তব্য নিয়ে নীরবতার অভিযোগ

২৫ অক্টোবর মিশিগানে এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প এল-সাইদকে ‘জিহাদি’ বলে আখ্যা দেন। এ সময় তিনি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গও তোলেন এবং বলেন, এল-সাইদের সিনেটে প্রবেশের সময় মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যাওয়া উচিত।

এর পরবর্তী তিন দিনে ৩৪টি সংবাদমাধ্যম এ ঘটনা নিয়ে ৩৮টি শিরোনাম প্রকাশ করে। এনপিআর শিরোনামে ট্রাম্পের বক্তব্যকে এল-সাইদের বিরুদ্ধে মুসলিমবিদ্বেষী আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরে। সিবিএস নিউজও তার ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের আক্রমণের বিষয়টি উল্লেখ করে।

তবে এল-সাইদকে নিয়ে ১৮১টি শিরোনাম প্রকাশ করা ফক্স নিউজ এ ঘটনাকে একটি সংবাদ-সংকলনে সংক্ষেপে উল্লেখ করে। অন্যদিকে, নিউইয়র্ক পোস্ট এ নিয়ে কোনো শিরোনাম প্রকাশ করেনি। একই দুই দিনে এল-সাইদকে সমর্থনকারী একটি বিজ্ঞাপনে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য ইসরাইলকে দায়ী করার বিষয়টি নিয়ে পাঁচটি শিরোনাম প্রকাশ করেছিল পত্রিকাটি।

মুসলিম প্রার্থীকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করে তিন মাস ধরে সংবাদ প্রকাশ করা এই দুই সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পের সরাসরি আক্রমণের সময় বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।

এল-সাইদের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ

এল-সাইদের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের সম্পর্কের অভিযোগের ক্ষেত্রে তার পরিবারের সদস্যদের কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

১৫ অক্টোবর ফক্স নিউজের একটি প্রতিবেদনে ট্রাম্পের বক্তব্যের বরাত দিয়ে এল-সাইদকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ প্রকাশ করা হয়। ফক্সের ওই প্রতিবেদনে অভিযোগের পক্ষে যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল, তা মূলত এল-সাইদের বৈমাত্রেয় বোনের ২০১২ সালের দুটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট। পোস্টগুলোতে ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে মিসরে তাঁদের মায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ ছিল।

এল-সাইদের জন্ম ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে। ফলে তার জন্মেরও এক দশকের বেশি আগে তার মায়ের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাকে যুক্ত করার বিষয়টি প্রতিবেদনে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।

ফক্স নিউজের ৩০৫ শব্দের ওই প্রতিবেদনের মধ্যে ১৯৯ শব্দে ট্রাম্পের অভিযোগ ও এল-সাইদের মাকে নিয়ে পোস্টের কথা তুলে ধরা হয়। এল-সাইদের অস্বীকৃতির জন্য রাখা হয় ৯৫ শব্দ। তার প্রচারশিবিরের মন্তব্য চাওয়ার কথা জানাতে ব্যয় হয় ১১ শব্দ। কিন্তু তার মায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে এল-সাইদের ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায় না—এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে কোনো শব্দ ব্যয় করা হয়নি বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরদিন অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো কেন খবরটি প্রকাশ করেনি, তা নিয়ে ফক্স নিউজ প্রশ্ন তোলে। ওই প্রতিবেদনে সিএনএনের সাংবাদিক অ্যাবি ফিলিপের বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়। তিনি বলেন, এল-সাইদ তার জৈবিক মায়ের কাছে বড় হননি; তার বয়স যখন তিন বছর, তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। ফলে মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের ভিত্তিতে তাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ যাচাই করা হয়নি এবং তার মিশিগানে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক নেই।

অভিযোগের জবাব দেওয়াকে ‘উত্তেজিত আচরণ’ হিসেবে তুলে ধরা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগের জবাব দেওয়ার সময় এল-সায়েদের প্রতিক্রিয়াকেও কিছু সংবাদমাধ্যম নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছে।

১৫ অক্টোবর ফক্স নিউজের এক শিরোনামে বলা হয়, পরিবারের মুসলিম ব্রাদারহুড-সম্পর্কিত অভিযোগ নিয়ে প্রশ্নের মুখে এল-সাইদ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। একই দিনে নিউইয়র্ক পোস্ট তার প্রতিক্রিয়াকে ‘ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা’ হিসেবে তুলে ধরে। ডেইলি মেইলও ২২ অক্টোবরের এক শিরোনামে তাকে ‘নিয়ন্ত্রণ হারানো’ ধরনের ভাষায় বর্ণনা করে।

অথচ এল-সাইদ প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, তিনি ১৯৮৪ সালে মিশিগানে জন্মেছেন, সেখানেই বড় হয়েছেন এবং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তার জন্মেরও আগে মিসরে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে তাকে কেন জবাব দিতে হবে।

নিজের জন্মের অনেক আগের পারিবারিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্নের জবাবে এল-সায়েদ প্রশ্নটির যৌক্তিকতা জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কয়েকটি সংবাদমাধ্যম তার প্রতিক্রিয়াকে উত্তেজিত বা আক্রমণাত্মক আচরণ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তথ্য যাচাইকারী সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন

এল-সাইদের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি সমর্থন জানানোর অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও তথ্য যাচাইকারী সংস্থা অনুসন্ধান করেছে।

ব্রিজ মিশিগান এল-সাইদ মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি। ১৯ অক্টোবর পলিটিফ্যাক্ট রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সের এই দাবি মিথ্যা বলে মূল্যায়ন করে যে, এল-সাইদ মুসলিম ব্রাদারহুডের নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

২৭ অক্টোবর ট্রাম্পের এল-সাইদকে ‘জিহাদি’ ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য বলার দাবিকেও পলিটিফ্যাক্ট সম্পূর্ণ মিথ্যা হিসেবে মূল্যায়ন করে। এ ছাড়া, রজার্সের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের একটি শিরোনাম সংশোধন করে।

তবে ফক্স নিউজ ও নিউইয়র্ক পোস্টের মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা ৪৩টি প্রতিবেদনের কোনোটিতেই এসব তথ্য যাচাইয়ের ফলাফল উদ্ধৃত করা হয়নি।

বিশ্লেষণের সীমাবদ্ধতা

নিউজকর্ডের বিশ্লেষণ সংবাদমাধ্যমটির নিজস্ব আর্কাইভে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ১৪১টি সংবাদমাধ্যমের ৯২০টি শিরোনাম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংরক্ষিত ৭৪০টি পূর্ণাঙ্গ সংবাদ পর্যালোচনা করা হয়েছে।

আর্কাইভে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত সব খবর নেই। ফলে বিশ্লেষণটি তাদের সব সংবাদ বা সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। তবু সংরক্ষিত শিরোনাম ও প্রতিবেদনের তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এল-সাইদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরার ক্ষেত্রে ফক্স নিউজ ও নিউইয়র্ক পোস্টের শিরোনাম এবং অভিযোগের পক্ষে প্রমাণের অভাব সম্পর্কে তাদের প্রতিবেদনের ভাষার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান ছিল।

সূত্র: নিউজকর্ডের বিশ্লেষণ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন