ক্ষমতা ও ভূমিকার দিক থেকে সেনাপ্রধানের পর সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইনটেলিজেন্স বা আইএসআই’র মহাপরিচালককে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী দেশের নির্বাচিত সরকারপ্রধান হলেও ক্ষমতার দিক থেকে তার অবস্থান কার্যত তিন নম্বরে।
২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আইএসআই’র প্রধান ছিলেন লে. জেনারেল অব. ফয়েজ হামিদ। সেই সময় মনে করা হতো যে, তিনি পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। এর কারণ হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের তৎকালীন সরকারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা সামনে আনা হয়। কিন্তু ইমরানের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রভাব হারান জেনারেল হামিদও।
সম্ভবত এ কারণেই তিনি অকালেই অবসর নেওয়ার আবেদন করেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে তিনি হাইকমান্ডের কাছে তার পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছিলেন। অথচ, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ দুই পদের জন্য পাকিস্তানের জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স যে ছয়জন প্রবীণ জেনারেলের নামের তালিকা তৈরি করেছিল তাদের মধ্যে জেনারেল হামিদের নামও ছিল। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অনুমোদনের জন্য নামগুলো প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাছেও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন।
অকালে অবসর গ্রহণের পর তার বিরুদ্ধে আইএসআই প্রধান থাকার সময় টপ সিটি নামের একটি আবাসন কোম্পানিতে অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। টপ সিটির মালিক মইজ আহমেদ খান ২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এতে জেনারেল হামিদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়। মইজ আহমেদ খান তার পিটিশনে উল্লেখ করেছিলেন যে, জেনারেল হামিদের নির্দেশেই ২০১৭ সালের ১২ মে তার অফিস ও বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিলেন আইএসআই কর্মকর্তারা। তার এই অভিযোগের পর সুপ্রিম কোর্ট মইজ আহমেদ খানকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করার নির্দেশ দেন।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী জেনারেল হামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করে। কয়েক মাস তদন্তের পর গত বছরের ১২ আগস্ট জেনারেল হামিদকে গ্রেপ্তার করে সেনাসদস্যরা। এরপর কোর্ট মার্শাল বা সেনা আইনে তাকে বিচারের আওতায় আনা হয়। গত ১০ ডিসেম্বর কোর্ট মার্শালে তার বিচার করা হয়। পাকিস্তানের ইতিহাসে আইএসআই’র সাবেক কোনো প্রধানকে কোর্ট মার্শালে বিচারের ঘটনা এটাই প্রথম।
পরে আইএসআই’র জনসংযোগ বিভাগ এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে, ‘পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের আদেশ মেনে লে. জেনারেল অব. ফয়েজ হামিদের বিরুদ্ধে টপ সিটি সংক্রান্ত অভিযোগের যথার্থতা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী একটি বিশদ তদন্ত আদালত গঠন করেছিল। এরপর পাকিস্তান সেনা আইনের বিধানের অধীনে তার বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’ তবে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা অবশ্য উল্লেখ করা হয়নি আইএসপিআর’র বিবৃতিতে।
টপ সিটি কেলেঙ্কারি ছাড়াও জেনারেল ফয়েজ হামিদের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ’ এবং ‘গোপনীয়তার আইন’ লঙ্ঘনের অভিযোগও আনা হয়েছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ‘অস্থিতিশীলতা পরিস্থিতি সৃষ্টি’ এবং ‘বিশেষ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের’ অভিযোগের তদন্তও করা হচ্ছে। এসব অভিযোগে তার বিচার কার্যক্রম চলছে এবং তা শেষ হতে আরও কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন জেনারেল হামিদের আইনজীবী মিয়া আলী আশফাক। তিনি জানিয়েছেন, তার মক্কেল নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিচারে জেনারেল হামিদের কী শাস্তি হবে তা গোপনীয়তা আইনের কারণের বাইরে প্রকাশ করা যাবে না বলে জানিয়েছেন এই আইনজীবী।
জেনারেল হামিদের জন্য এটা ধপাস করে পতনের মতোই একটি ঘটনা বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কারণ, আইএসআই প্রধান থাকার সময় তিনি চোখ রাঙিয়েছেন পার্লামেন্টকে, আদালতের বিচারক এবং বিরোধী সমর্থক সাংবাদিকদের অস্থির করে রাখতেন। তার আগে যারা আইএসআই প্রধান ছিলেন তাদের কেউ বরখাস্ত, কাউকে অন্যত্র বদলি বা কাউকে তিরস্কার করা হয়েছে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য। কিন্তু জেনারেল ফয়েজ হামিদই প্রথম সাবেক আইএসআই প্রধান যিনি কোর্ট মার্শালে বিচারের মুখোমুখি হলেন। তার অপরাধের মাত্রা অনেক হলেও একটিমাত্র ‘পাপের’ কারণে তাকে আজ এই পরিণতির সম্মুখীন হতে হলো। আর সেই পাপটি হলো বর্তমানে কারাবন্দি ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় তার সঙ্গে জেনারেল হামিদের ঘনিষ্ঠতা। এমনকি সরকার ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিবর্তন আসার পরেও তিনি ইমরান খানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন যা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
এ সম্পর্কে ফয়সাল ভাওদা নামের একজন সিনেটর বলেছেন, জেনারেল হামিদের ধারণা ছিল, ইমরান খান আবারও প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি আইএসআই’র ডিজি পদে ফিরে আসতে পারবেন। কিন্তু জেনারেল হামিদের কোর্ট মার্শালে বিচার থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এর জন্য সামনের দিনগুলোতে আরও নানা সমস্যা অপেক্ষা করছে।
২০২৩ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় সামরিক স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুরের অভিযোগে গত মাসে অর্থাৎ ডিসেম্বরে সামরিক আদালতে বিচারের মাধ্যমে ইমরান খানের এক ভাগনেসহ পিটিআই’র ৮৫ নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছে। তবে সাধারণ জনগণের সামরিক আদালতে বিচার করার সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ১৩ জানুয়ারি ইমরান খান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার রায় দেওয়ার কথা রয়েছে।
নানামুখী চাপের মুখে পিটিআই তার আগের অবস্থান থেকে সরে আসছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে ইমরান খানকে মুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার পর পিটিআই এখন শাহবাজ শরিফের সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। এরই মধ্যে পার্লামেন্টে দুই দফা বৈঠক হয়েছে দু’পক্ষের মধ্যে। তারা ইমরান খানসহ দলের নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি করছে সরকারের কাছে। এটা পিটিআই’র দুর্বল অবস্থানেরই ইঙ্গিত বহন করে।
তবে চলতি বছর ইমরান খান ইস্যুতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। আর তা হচ্ছে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগত ট্রাম্প প্রশাসনের স্পেশাল মিশনবিষয়ক ট্রাম্পের দূত রিচার্ড গ্রেনেল ইমরান খানের পক্ষে বেশ কয়েকটি টুইট করেছেন। এ থেকে ধারণা করা যায় যে, দায়িত্ব গ্রহণের পর ট্রাম্প কারাবন্দি ইমরান খানের মুক্তির বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখাতে পারেন। এর আগে ২০২২ সালে ইমরান খান অভিযোগ করেছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রশাসন ষড়যন্তের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ভূমিকা রেখেছিল।
এদিকে অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি বাইরের সঙ্গেও পাকিস্তানের ঝামেলা বাড়ছে। সম্প্রতি প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্তে সংঘাতের ঘটনা পাকিস্তানের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। গত ২৪ ডিসেম্বরেও পাকিস্তান আফগাস্তিানের তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) অবস্থানে বিমান হামলা চালাল অন্তত ৫০ জন আহত হয়। এর প্রতিশোধ নিতে আফগান তালেবান ২৮ ডিসেম্বরেও পাকিস্তানের সীমান্তের কয়েকটি স্থানে হামলা করে। এতে পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। সামনে দু’পক্ষের মধ্যে আরও সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান আবারও ক্ষমতা দখলের পর সেপ্টেম্বর মাসে কাবুল সফরে যান তৎকালীন আইএসআই প্রধান জেনারেল ফয়েজ হামিদ। সেখানে তিনি চা পান করার সময় তালেবান নেতাদের বলেছিলেন, ‘আপনারা ভয় পাবেন না, সব কিছুই ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু এখন তার সেই কথার উল্টোটাই ঘটছে। তার এবং পাকিস্তানের জন্য কোনো কিছুই ঠিকমতো হচ্ছে না। সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

