আল জাজিরার বিশ্লেষণ

তুরস্কের সঙ্গে টানাপোড়েন: আজারবাইজানে হিজাব বিতর্কের নেপথ্যে

তুরস্কের সঙ্গে টানাপোড়েন: আজারবাইজানে হিজাব বিতর্কের নেপথ্যে
ছবি: সংগৃহীত

আজারবাইজানের সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে হিজাব পরা নিয়ে বিতর্ক ব্যক্তিগত সংকটে রূপ নিয়েছে শিক্ষিকা গুলশান আলিয়েভার জন্য। এ বিতর্ক তার পেশাগত জীবন ও মেয়ের শিক্ষাজীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

২৩ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইংরেজি শিক্ষিকা আলিয়েভা চলতি সপ্তাহে মাথায় হিজাব পরে বিদ্যালয়ে গেলে তাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে বাকুতে তার মেয়েকেও বিদ্যালয়ে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয় বলে আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

আলিয়েভা বলেন, ‘আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে চাই, শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করতে চাই এবং ধর্মীয় বিশ্বাস যেন আমার চাকরির পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করে পেশাগত জীবন চালিয়ে যেতে চাই।’

তিনি যুক্তি দেন, আজারবাইজানের শ্রম আইনের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গত মাসে জারি করা নতুন বিধিমালায় সরাসরি হিজাব নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়নি। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পোশাক পরার ওপর শিক্ষার্থীদের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিমÑএমন একটি দেশে এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

আলিয়েভাসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। নতুন বিধিমালা লঙ্ঘনের পাশাপাশি জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অভিযোগে সোমবার ৩৭ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

আলিয়েভা বলেন, ‘কোনো বাধা ছাড়াই কাজ করার এবং শিক্ষা গ্রহণের সাংবিধানিক অধিকার আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি জানান, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাবেন। ততদিন তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

এদিকে, বাকু সিটি শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, বিদ্যালয়গুলোতে নতুন বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।

ককেশাস মুসলিম বোর্ডের (সিএমবি) চেয়ারম্যান শেখ-উল-ইসলাম আল্লাহশুকুর পাশাজাদে মঙ্গলবার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, হিজাব ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বাধ্যবাধকতা।

তিনি বলেন, মানুষ রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে না পারলেও নাগরিক হিসেবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য বিক্ষোভকারীদের সমালোচনা করেন তিনি।

পাশাজাদে আরো বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিষয়টিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। সমালোচকদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি।

পোশাকবিধি নিয়ে ভিন্নমত

তবে সবাই মনে করেন না যে এ বিধিনিষেধ ব্যক্তিস্বাধীনতার লঙ্ঘন।

বাকুর বাসিন্দা তিমুর রাজায়েভের মতে, হিজাব নিয়ে বিতর্ককে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হয়েছে। তার মতে, এ নিয়ে বিতর্কে না জড়িয়ে সরকারের নির্ধারিত পোশাকবিধি মেনে চলা উচিত।

তিনি বলেন, ইউনিফর্ম ও পোশাকবিধি বাস্তবায়নে সরকারের একটি সিদ্ধান্ত রয়েছে।

১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের হিজাব পরারও বিরোধিতা করেন রাজায়েভ। তার যুক্তি, এ ধরনের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের নিজেদের ইচ্ছার পরিবর্তে মা-বাবার পছন্দের প্রতিফলন ঘটায়।

তার এ অবস্থানের সঙ্গে আজারবাইজানের এমন অনেক নাগরিকের উদ্বেগের মিল রয়েছে, যারা মনে করেন, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ধর্মীয় অনুশীলনকে মেলানো উচিত নয়।

রাজায়েভ বলেন, ‘আমরা একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, যেখানে ধর্মপ্রাণ মানুষের অধিকারকে সম্মান করা হয়।’

সোভিয়েত আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় অনুশীলনের ওপর বিধিনিষেধ ছিল। মানুষ স্বাধীনভাবে ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতে পারত না। স্বাধীনতার পর এসব বিধিনিষেধ শিথিল করা হয় এবং ধর্ম পালনের সুযোগ বাড়ে।

বিরোধী দল রিয়েল পার্টির প্রধান নাতিগ জাফারলির মতে, শিক্ষার্থীদের হিজাব পরার বিষয়টি নিয়ে আরো আলোচনা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘ছাত্রীদের হিজাব পরার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর একটি সমঝোতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’

তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষকেরা প্রাপ্তবয়স্ক। তাদের পোশাকের ওপর এ ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা ভুল পদক্ষেপ।’

তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন

হিজাব বিতর্ক আজারবাইজানের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোর একটিতেও প্রভাব ফেলেছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ানের উপদেষ্টা ওকতাই সারাল আজারবাইজানের পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘বিশ্বাসের কারণে মাথা ঢেকে রাখা একজন শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ের ফটকে আটকে রাখা—এটি কীভাবে কারো বিবেক কিংবা ন্যায়বিচারের বোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে পারে?’

এর জবাবে মঙ্গলবার আজারবাইজানের ক্ষমতাসীন দল নিউ আজারবাইজান পার্টি (ওয়াইএপি) সারালের মন্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আখ্যা দেয়। দলটির বক্তব্য, এ ধরনের মন্তব্য দুই ঘনিষ্ঠ মিত্রের সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে।

আজারবাইজানের পার্লামেন্ট জাতীয় পরিষদের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ ওরুজ বলেন, এ পদক্ষেপ ধর্মীয় বৈষম্য কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, বিদ্যালয়ের বাইরে মাথায় স্কার্ফ পরার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে পোশাকের ক্ষেত্রে অভিন্ন নিয়ম বজায় রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য।

তিনি আরো বলেন, আজারবাইজানের অনেক মানুষ হিজাব পরেন না, কিন্তু পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে কোরআনকে শ্রদ্ধা করেন এবং সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস রাখেন। তার মতে, বিদ্যালয়ের পোশাকবিধি নিয়ে মতবিরোধকে ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ হিসেবে দেখা উচিত নয়।

আজারবাইজানের ন্যাশনাল এনজিও ফোরামও বিতর্কটিকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার সমালোচনা করেছে।

সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা

আজারবাইজানের সংবিধানে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা হয়েছে বিবেক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা।

অর্থাৎ, একই সাংবিধানিক কাঠামোয় ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা-দুই নীতিই স্বীকৃত। সরকারি বিদ্যালয়ে পোশাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কীভাবে এ দুই নীতির মধ্যে সমন্বয় করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আজারবাইজানভিত্তিক টলারেন্স পাবলিক অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল রিসার্চের চেয়ারম্যান আজার রাশিদোগলুর মতে, নতুন বিধিমালা সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

রাশিদোগলু বলেন, ‘যাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, তাদের সম্মিলিতভাবে আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রতিকার চাওয়া উচিত। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত উপায়ে নিজেদের দাবি আদায়ের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।’

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন