আমেরিকা-ইসরাইলের হামলায় ইরানের একের পর এক শীর্ষ নেতার মৃত্যুর পরও ইরানকে নত করা যায়নি। বরং হরমুজ প্রণালি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর ঘাঁটিতে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। এতে একদিকে যেমন আমেরিকা নিজেদের বিজয়ী দাবি করতে পারছে না, অন্যদিকে যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তাদের ব্যাপক অর্থনৈতিক ব্যয় সামাল দিতে হচ্ছে। এ যুদ্ধে ইতোমধ্যে ২২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স।
ইসরাইলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের হামলায় ১৯২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা কিছুটা গুরুতর। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মোট তিন হাজার ৭২৭ জন ইসরাইলি আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ইরানের হামলায় উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউনাইটেড আরব আমিরাত (ইউএই)। প্রতিশোধ হিসেবে ইরান জিসিসি দেশগুলোর দিকে প্রায় তিন হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। যার অর্ধেকের বেশি ছোড়া হয়েছে আবুধাবির বিভিন্ন স্থান লক্ষ্য করে। গত রাতও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ভোর প্রায় ৩টার দিকে দুবাই জুড়ে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শুধু দুবাই নয়, বরং জিসিসিভুক্ত অন্যান্য শহরেও হামলা চালিয়েছে ইরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, আমেরিকা-ইসরাইলের হত্যাকাণ্ড তেহরানের মজবুত রাজনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে দিতে পারবে না। ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানিকে হত্যা দেশটির নেতৃত্বে কোনো বড় ধরনের ধাক্কা দেবে না বলেই মন্তব্য করেন তিনি।
আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, আমেরিকা ও ইসরাইল এখনো বুঝতে পারেনি যে ইরানের সরকার কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না।
তিনি বলেন, আমি জানি না কেন আমেরিকান ও ইসরাইলিরা এখনো এ বিষয়টি বুঝতে পারেনি। ইরানের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামো রয়েছে। কোনো একক ব্যক্তির থাকা না এ কাঠামোকে প্রভাবিত করে না।
আরাঘচি উল্লেখ করেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা-ইসরাইলের হামলার প্রথমদিনেই দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এত বড় ক্ষতির পরও ইরান এখনো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলেন, একজন শহীদ হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে তার বিকল্প নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীও শহীদ হন শেষ পর্যন্ত তার জায়গায় অন্য কেউ দায়িত্ব নেবেন।
নিহত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার উত্তরসূরি মুজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ ছিলেন ৬৭ বছর বয়সী লারিজানি। সোমবার রাতের এক হামলায় তিনি নিহত হন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম মঙ্গলবার আরো নিশ্চিত করেছে, আমেরিকা-ইসরাইলের হামলায় ইরানের আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানি নিহত হন। তিনি গত ছয় বছর ধরে বাসিজের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আমেরিকা-ইসরাইলের যুদ্ধের প্রতিরোধে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে উদিত হয়েছিলেন।
আলজাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলেন, ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে আসছে, যা যুদ্ধের স্বাভাবিক নিয়মের পরিপন্থী।
তিনি বলেন, ইসরাইল যেভাবে রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করে এ কাজগুলো অনেকটা গ্যাংস্টারদের মতো, যা যুদ্ধের পরিপন্থী এক ধরনের সন্ত্রাসবাদ।
বিশারা আরো বলেন, ইরানের ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং একজন নেতার মৃত্যু পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেবে না। তবে এ ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রভাব রয়েছে।
আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিস্তৃত এলাকায় চলমান সংঘাত তেহরানের পছন্দ নয় এবং শেষ পর্যন্ত এর দায় আমেরিকাকেই নিতে হবে। তিনি বলেন, এটা আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এটি শুরু করিনি। বরং আমেরিকা এটি শুরু করেছে, ফলে এতে যে ধরনের মানবিক ও আর্থিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে তার একক দায় তাদের। আমেরিকাকে এজন্য অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
ট্রাম ইরানে হামলার পরপরই একপ্রকার বিজয় দাবি করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন ইরানের শাসকদের হত্যা করতে পারলেই হয়তো ইরান মাথা নত করবে এবং তিনি ভেনেজুয়েলার মতো ইরানে একধরনের অনুগত শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটেনি। ফলে আমেরিকা-ইসরাইলের হামলায় একদিকে যেমন মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে একই সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বব্যবস্থায় যে ধরনের অস্থিরতা তৈরি হবে, তার ভার ট্রাম্প কি বইতে পারবেন!
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

