আরবরা বিজ্ঞানচর্চায় অবদান রাখে না, নোবেল পুরস্কার জেতে না, এমনকি সাহিত্যও সৃষ্টি করে না—এমন মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র (আরএফকে জুনিয়র)। তার বক্তব্যকে মিথ্যা, বর্ণবাদী ও আরববিদ্বেষ উসকে দেওয়ার মতো বলে সমালোচনা করেছেন নাগরিক অধিকারকর্মী, স্বাস্থ্য খাতের সংগঠন এবং ডেমোক্র্যাট নেতারা।
গত সোমবার মিশিগানের গ্র্যান্ড র্যাপিডসে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিয়ে এসব মন্তব্য করেন কেনেডি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেওয়া তার বক্তব্যের পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
কেনেডি বলেন, ‘বিশ্বে ৫০ কোটি আরব রয়েছে। অথচ তারা বিজ্ঞান সৃষ্টি করে না, নোবেল পুরস্কার জেতে না, ফিল্ডস পুরস্কার জেতে না, উলফ পুরস্কারও পায় না। তারা সাহিত্যও সৃষ্টি করে না।’
তিনি এসবের জন্য মুসলিম ব্রাদারহুডকে দায়ী করেন। তার দাবি, সংগঠনটির উত্থানের ফলে আরব সমাজে বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প ও প্রকৌশলে অবদানের ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে গেছে। মুসলিম ব্রাদারহুড এমন সমাজ তৈরি করেছে, যেখানে ঘৃণা, যুদ্ধ ও নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করা ছাড়া আর কিছু নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কেনেডির বক্তব্যের পর সমালোচকেরা স্মরণ করিয়ে দেন, আরব বংশোদ্ভূত বহু বিজ্ঞানী, লেখক ও ব্যক্তিত্ব নোবেলসহ বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেছেন। ফলে তার দাবির সঙ্গে ঐতিহাসিক তথ্যের মিল নেই।
মিশিগানে বড় আরব-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর বসবাস। এমন একটি রাজ্যে কেনেডির এই মন্তব্যকে বিশেষভাবে সংবেদনশীল বলে মনে করছেন সমালোচকেরা। একই সময়ে মিশিগানে ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইদের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন রিপাবলিকানরা। এল-সাইদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নোবেলসহ আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন আরবরা
কেনেডির বক্তব্যের বিপরীতে আরবদের বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক অর্জনের একাধিক উদাহরণ তুলে ধরেছে সংবাদমাধ্যমগুলো।
মিসরীয়-আমেরিকান রসায়নবিদ আহমেদ জুয়াইল ১৯৯৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান। অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি উদ্ভাবনে তার অবদানের জন্য এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর আগে ১৯৯৩ সালে তিনি রসায়নে উলফ পুরস্কারও অর্জন করেন।
মিসরীয় লেখক নাগিব মাহফুজ ১৯৮৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। আর ইয়েমেনের সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী তাওয়াক্কুল কারমান ২০১১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের সহপ্রাপক হন।
এ ছাড়া মিসরের কূটনীতিক ও সাবেক আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এলবারাদি ২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত জর্ডানে জন্ম নেওয়া রসায়নবিদ ওমর এম ইয়াগি ২০২৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কারের অন্যতম প্রাপক হন। তিনি ২০১৮ সালে রসায়নে উলফ পুরস্কারও পেয়েছিলেন।
লেবানিজ বংশোদ্ভূত গণিতবিদ মাইকেল আতিয়াহ ১৯৬৬ সালে গণিতের মর্যাদাপূর্ণ ফিল্ডস পদক অর্জন করেন। এ ছাড়া সাবেক ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ১৯৯৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতও ১৯৭৮ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের সহপ্রাপক ছিলেন।
এসব উদাহরণ কেনেডির বক্তব্যের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও আরব ও আরব বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জনের তথ্য তুলে ধরেছে।
বর্ণবাদী বক্তব্যের অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকারবিষয়ক সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার) কেনেডির মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছে। সংগঠনটি তার বক্তব্যকে প্রকাশ্য বর্ণবাদ ও গোঁড়ামির স্পষ্ট উদাহরণ বলে অভিহিত করেছে।
কেয়ারের ভাষ্য, মানবসভ্যতায় আরবদের অবদান অস্বীকার করার এই প্রচেষ্টা শুধু মিথ্যাই নয়, বরং আরব ও মুসলিমবিদ্বেষ উসকে দিতে পারে। সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য আসায় সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংগঠনটি।
স্বাস্থ্যবিষয়ক সংগঠন প্রটেক্ট আওয়ার কেয়ারও কেনেডির বক্তব্যকে বর্ণবাদী আক্রমণ হিসেবে সমালোচনা করেছে।
বিজ্ঞানী ও টেক্সাস চিলড্রেনস হাসপাতালের ন্যাশনাল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের প্রতিষ্ঠাতা ডিন পিটার হোটেজও এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি আরব বিজ্ঞানীদের ঐতিহাসিক অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেন, মধ্যযুগে আরব বিজ্ঞানীরা অ্যারিস্টটল, হিপোক্রেটিস ও গ্যালেনের মতো প্রাচীন চিন্তাবিদদের রচনা সংরক্ষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ইউরোপের রেনেসাঁ যুগে এসব জ্ঞান হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও তাদের অবদান ছিল।
হোটেজ তার প্রয়াত সহকর্মী নোবেলজয়ী আহমেদ জুয়াইলের কথা উল্লেখ করে বলেন, কেনেডির বক্তব্যের সঙ্গে জুয়াইল একমত হতেন না।
রাজনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপট
কেনেডি মিশিগানে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সের পক্ষে প্রচার চালানোর সময় এসব মন্তব্য করেন। রজার্সের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইদ একজন মুসলিম এবং তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এল-সাইদকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য বলে অভিযোগ করেছেন এবং তাকে ‘জিহাদি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হাজির করা হয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বলেছেন, মুসলিম আমেরিকানদের শুধু নাগরিক হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও অগ্রহণযোগ্য করে তোলার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার বিষয়ে সবার সতর্ক হওয়া উচিত।
মুসলিম ব্রাদারহুড ১৯২৮ সালে মিসরে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটি ও এর বিভিন্ন শাখা নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারের অবস্থান ভিন্ন। কয়েকটি দেশ সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ কেনেডির মন্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
সূত্র: এপি, রয়টার্স, এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এএনআই) ও আল জাজিরা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


