পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা তাদের সম্পদ মুক্ত করার বিষয়টি সবচেয়ে বিতর্কিত ও জটিল ইস্যুগুলোর একটি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেখানেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বিদেশে থাকা তহবিলে প্রবেশাধিকার পাওয়ার চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছে তেহরান। এসব অর্থের বড় অংশ নিষেধাজ্ঞা ও ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো তাদের নাগালের বাইরে রয়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীন, ইরাক, ভারতসহ অন্য কয়েকটি দেশে এসব সম্পদ জব্দ আছে, তবে এগুলোতে প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে কি না- তা নির্ধারণে ওয়াশিংটনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অর্থের আংশিকও উন্মুক্ত করা গেলে বহু বছরের নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাতে বিপর্যস্ত অর্থনীতির জন্য তা হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা।
তবে তাদের সতর্কবার্তা হলো, আইনি, আর্থিক ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে কোনো চুক্তিকে বাস্তব অর্থ স্থানান্তরে রূপ দিতে সময় লাগবে এবং প্রক্রিয়াটি হবে জটিল।
তাহলে এই অর্থ আসলে কী ধরনের এবং ইরান কতটা সহজে এতে প্রবেশ করতে পারে?
এই সম্পদের মধ্যে কী কী রয়েছে
ইরানের জব্দকৃত সম্পদের মোট মূল্য নিয়ে কোনো সরকারি হিসাব নেই, তবে বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় ২৭ বিলিয়ন বা দুই হাজার ৭০০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি।
এই অর্থ কোনো একক ও সহজলভ্য হিসাবে জমা নেই। বরং এর মধ্যে রয়েছে তেল বিক্রির আয়; তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ রপ্তানির অর্থ; বিদেশি ব্যাংকে সংরক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং কয়েক দশক পুরোনো আইনি বিরোধে আটকে থাকা সম্পদ।
ইরান বিদেশে তেল বিক্রি করলে সাধারণত সেই ক্রেতা দেশের ব্যাংক হিসাবেই অর্থ জমা হয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে তেহরান অনেক সময় এই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
সম্পদ জব্দের প্রথম বড় ধাপ শুরু হয় ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকটের পর।
পরবর্তী একটি চুক্তির আওতায় কিছু সম্পদ মুক্ত করা হলেও, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে স্বাক্ষরিত সামরিক চুক্তিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু দাবি ও সম্পদের বিষয় এখনো নিষ্পত্তিহীন রয়ে গেছে।
দ্বিতীয় এবং আরো বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞার ঢেউ শুরু হয় ২০১১-১২ সালে, যখন পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার কিছু অংশ থেকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে ২০১৮ সালে সরে যাওয়ার পর এসব বিধিনিষেধ আরো জোরদার হয়।
ইরানের নিষেধাজ্ঞা বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে আরো বেশি পরিমাণে রাজস্ব বিদেশে আটকে পড়ে। কিছু অর্থ আনুষ্ঠানিকভাবে জব্দ হয়, আবার কিছু অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর সীমাবদ্ধতার আওতায় চলে যায়।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক স্নেইডারের মতে, জব্দ হওয়ারও বিভিন্ন ধরন আছে। এর মধ্যে রয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে অবরুদ্ধ অর্থ, দেশে ফেরত আনা যায় না এমন রাজস্ব এবং চলমান আইনি বিরোধে আটকে থাকা অর্থ।
অর্থগুলো কোথায় রাখা আছে
ইরানের আটকে থাকা তহবিলের বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অবরুদ্ধ আছে।
এর একটি বড় অংশ রয়েছে চীনে, যারা ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন বা দুই হাজার কোটি থেকে ৫০ বিলিয়ন বা পাঁচ হাজার কোটি ডলারের মধ্যে।
আরেকটি বড় অংশ রয়েছে ইরাকে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ রপ্তানির অর্থ থেকে সৃষ্ট এই তহবিলের পরিমাণ আনুমানিক এক হাজার কোটি থেকে দেড় হাজার কোটি ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় অবরুদ্ধ ইরানি তেল বিক্রির প্রায় ৬০০ কোটি ডলার ২০২৩ সালে কাতারের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। তবে পরে ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দেয় যে, নিকট ভবিষ্যতে ইরান এই অর্থ ব্যবহার করতে পারবে না। ফলে কার্যত অর্থটি দোহাতেই স্থির অবস্থায় থেকে যায়।
ভারতে ইরানের ৭০০ কোটি ডলার আটকে আছে।
এছাড়া জাপান ও লুক্সেমবার্গসহ আরো কয়েকটি দেশে ইরানের অর্থ সংরক্ষিত বা অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারে থাকা অর্থের পরিমাণ তুলনামূলক কম, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ২০০ কোটি ডলার। এর বড় অংশ আদালতের রায় ও ক্ষতিপূরণ দাবির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তা মুক্ত করা বিশেষভাবে স্পর্শকাতর।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আরএ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



আয়াতুল্লাহ খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু
আয়াতুল্লাহ খামেনির শেষ বিদায়ে ৬ দিনের আনুষ্ঠানিকতায় যা থাকছে