ভারতে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদসহ যেসব স্থাপনা ধ্বংস করেছে মোদি সরকার

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ভারতে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদসহ যেসব স্থাপনা ধ্বংস করেছে মোদি সরকার

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিয়ে অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছেন। পুরুলিয়ায় আরেক হতভাগ্য মুসলিম মাইমুর উগ্রবাদী হিন্দুদের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে এখন বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা করছেন।

বিজ্ঞাপন

ভীতসন্ত্রস্ত মাইমুর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা করে বলেন, হামলার মুহূর্তে আমি শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম। ওরা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে আমাকে ধাওয়া করছিল। আমি কোথায় লুকাব, তা বুঝতে পারছিলাম না। থানায় গেলে যে পুলিশ আমাকে সাহায্য করবে না, সেটা নিশ্চিত ছিলাম। তারপরও থানায় গিয়ে উঠলাম। পুলিশ তখন আমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে গরু পাচার মামলার আসামি বানিয়ে দিল। বুঝতে পারলাম, আমাদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে ভারতে বসবাস করা সবচেয়ে বড় অপরাধ!

মাইমুরই এখন ভারতের ২৫ কোটি মুসলিমের জীবনের প্রতিচ্ছবি। অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে জীবন পার হচ্ছে দেশটির মুসলিমদের। হতাশা আর আতঙ্ক এখন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। কখন যেন হিন্দু জঙ্গিদের হাতে প্রাণ যায়! মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয় অথবা বেঁচে থাকার অবশিষ্ট অবলম্বন জয় শ্রীরাম স্লোগানধারীদের বুলডোজারের নিজে চাপা পড়ে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তথা মুসলিমদের ওপর নানামুখী নির্যাতন দিন দিন বেড়েই চলছে। তথাকথিত গোরক্ষা গোষ্ঠীসহ উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে হত্যাসহ বহুমাত্রিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা। প্রতিনিয়ত প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে তাদের। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ২৭ জন মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এমনকি অনেক রাজ্যে তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে টার্গেটে পরিণত হয়েছে মুসলিমদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মাদরাসা, দরগা থেকে শুরু করে কবরস্থান পর্যন্ত। গত দেড় মাসে মসজিদসহ অন্তত ২৩টি ধর্মীয় স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা, পাবলিক প্লেসে নামাজ বা মসজিদের মাইক ব্যবহারের মতো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে কড়াকড়ি তৈরি হয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিদের সংখ্যা আগের চেয়ে কমে গেছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে মুসলিম শাসকদের ইতিহাস বাদ দেওয়া এবং ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত বিভিন্ন শহরের নাম পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছে।

বিজেপি সমর্থিত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং বজরং দলের (বিডি) মতো হিন্দু আধিপত্যবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো দেশজুড়ে, বিশেষ করে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় অবাধে তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনগুলোর সদস্যরা বিভিন্ন অজুহাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, আক্রমণ এবং হত্যা অব্যাহত রেখেছে।

পাহালগাম হামলা এবং তার ফলস্বরূপ পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পর দেশজুড়ে হাজার হাজার মুসলমানকে যথেচ্ছভাবে গ্রেপ্তার করে কর্তৃপক্ষ। ভারতজুড়ে হাজার হাজার বাংলাভাষী মুসলমানকে আটক করা হয় এবং গুজরাট ও আসামে তাদের বসতিগুলো নির্বিচারে ভেঙে দেওয়া হয়। এছাড়া একটি নতুন ‘পুশব্যাক’ নীতির অধীন যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই অন্তত এক হাজার ৮৮০ জনকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়, যাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।

বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় ৪৫ দিনে ২৩টির বেশি মুসলিম স্থাপনা ধ্বংস

ভারতে গত ৪৫ দিনে (দেড় মাসে) অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ ও দরগাহ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, এই উচ্ছেদ অভিযানের অধিকাংশই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে সংঘটিত হয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞগুলো মূলত দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাট এবং হরিয়ানা রাজ্যে চালানো হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকারকর্মী সংগঠন ‘জাস্টিস ফর অল’ ভারতে মসজিদ ভাঙার ঘটনা দ্রুতগতিতে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা সম্ভল, বারাণসী এবং জয়পুরে সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। ১০০০ বছরের পুরনো মসজিদ থেকে শুরু করে ২০০ বছরের পুরনো দরগাহ পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতের কয়েকটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মুসলিমদের ধর্মীয় স্থানগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো এই ধ্বংসযজ্ঞের ঢেউ গুরুতর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, এই ধ্বংসযজ্ঞগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না। মে মাস থেকে ছয়টি রাজ্য জুড়ে মসজিদ, দরগাহ, ঈদগাহ, মাদরাসাসহ অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। বারাণসীর ১০০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক মসজিদ গঞ্জ শহীদা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

দিল্লির মঙ্গোলপুরীতে অবস্থিত প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ‘দরগাহ পঞ্চ পীরান’ ভেঙে ফেলা হয়। এছাড়া রাজস্থানের জয়পুরের নূরানি মসজিদ, মুম্বাইয়ের বান্দ্রা ও গোরেগাঁওয়ের বেশ কয়েকটি মসজিদ ও দরগাহ এবং বারাণসীর গঞ্জ শাহিদা মসজিদও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ওয়াকফ বোর্ড এবং স্থানীয় তত্ত্বাবধায়কদের অভিযোগ, আইনি বাধা এবং স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও কোনো পূর্ব নোটিস ছাড়া তাড়াহুড়া করে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।

নির্বাচন-পরবর্তী মুসলিম নির্যাতন

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার শিকার মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে আমার দেশ-এর কলকাতা প্রতিনিধি জানান, পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার আসার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার শুরু হয়েছে ভারতের অন্যান্য বিজেপি-শাসনাধীন রাজ্যের মতো।

শুভেন্দু দায়িত্ব গ্রহণ করেই পশ্চিমবঙ্গে হিমন্ত ও যোগীর বুলডোজার ও উচ্ছেদ মডেলের পথ বেছে নিয়েছেন। মুসলিম বসতিস্থলে চলেছে বুলডোজার, তপশিয়া, তিলজলার বহুতলে বুলডোজার অ্যাকশন। কারণ, এগুলো নাকি অবৈধ আনপ্ল্যানড নির্মাণ। তপশিয়ায় বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দেওয়া ফ্ল্যাটের বাসিন্দা মুহাম্মদ ইরফান এখন সহায় সম্বলহীন।

রাতারাতি ফ্ল্যাট হারিয়ে বাস করছেন তিলজলার ছোট্ট ঘুপচি ঘরে। তিনি জানালেন, পুরো কলকাতা শহরজুড়ে অবৈধ নির্মাণ। প্ল্যান নেই সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই। কিন্তু মুসলমান, সেজন্য আমাদের বাড়িতে বুলডোজার চালিয়ে দিল। আমাদের মাল-সামান সরিয়ে নেওয়ার সময়টুকু দেয়নি প্রশাসন। বিজেপি সরকারের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই কাজ করিয়েছেন। আমরা এখন কী করব জানি না! এ রকম ইরফানের সংখ্যা প্রায় ৩০ জনের বেশি যারা তপশিয়ায় বুলডোজার অ্যাকশনে বাড়িছাড়া হয়েছেন। তারা কেউ আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ বা পাড়ি দিয়েছেন নতুন বাসার খোঁজে। তাদের মনে প্রশ্ন, বড়বাজার তো সবচেয়ে ঘিঞ্জি আনপ্ল্যানড এলাকা। সেখানে বুলডোজার চলছে না কেন? ওখানে বিজেপি জিতেছে, ওখানে হিন্দু মাড়োয়ারি, গুজরাতিরা থাকে বলে বুলডোজার যাবে না?

অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটসের (এপিসিআর) একটি বিস্তৃত রিপোর্ট বলছে, মে মাসের ৪ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে রাজ্যের অন্তত আটটি জেলায় ব্যাপক সহিংসতা, ভাঙচুর করা হয়েছে। কোচবিহার, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা মেট্রো, মুর্শিদাবাদ এবং হাওড়ার মতো জেলাগুলোতে সব মিলিয়ে ৩৪টি এ ধরনের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এই অসহিষ্ণুতার মর্মান্তিক পরিণতি হিসেবে অন্তত দুজনের প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে কোচবিহারের গোসানিমারিতে একটি মসজিদ রক্ষা করতে গিয়ে এক মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

এই ধারাবাহিক আক্রমণের ফলে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে অন্তত ৫৪টি সম্পত্তি যার মধ্যে বসতবাড়ি, দোকানপাট এবং দলীয় কার্যালয় রয়েছে আক্রমণ বা ধ্বংসের শিকার হয়েছে এবং শারীরিকভাবে বা অন্য কোনো উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন ব্যক্তি। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে মুসলিম মালিকানাধীন হোটেল বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া, আমতায় বেছে বেছে ১৫টি বাড়িতে ভাঙচুর চালানো এবং কলকাতার হকার ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো এই আগ্রাসনের স্পষ্ট প্রমাণ দেয়। শুধু তাই নয়, অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার একটি সুপরিকল্পিত রূপরেখাও দেখা গেছে, যেখানে হাওড়া, কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জোরপূর্বক গবাদি পশুর বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং মাংসের দোকানগুলোতে অবাধে হামলা চালানো হয়েছে।

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...